বৃষ্টি: আল্লাহর রহমত ও সর্তকবার্তা

লেখক : তাজাম্মুল হক সালাফী

বছর ধারাবাহিক ও প্রবল বৃষ্টিপাতের কারণে আমাদের আশপাশের বহু মানুষ চরম দুর্ভোগ ও কষ্টের মধ্যে রয়েছেন। কোথাও কোথাও বন্যা ও ভূমিধস মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে অত্যন্ত কঠিন করে তুলেছে।

প্রকৃতির প্রতিটি পরিবর্তন আল্লাহর মহান পরিকল্পনার অংশ। বৃষ্টি আল্লাহর পক্ষ থেকে এক মহান নিয়ামত। তবে কখনো কখনো তা তাঁর পক্ষ থেকে সতর্কবার্তা ও পরীক্ষাতেও পরিণত হতে পারে। তাই এ সময়ে বৃষ্টি এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ সম্পর্কে ইসলাম যে শিক্ষা ও বার্তা প্রদান করে, তা আমাদের গুরুত্বের সঙ্গে উপলব্ধি করা উচিত।

ক. বৃষ্টি: আল্লাহর রহমত ও পরীক্ষা :

বৃষ্টি আল্লাহর নিয়ামত—কুরআনের আলোতে : কুরআনে বৃষ্টির আলোচনা করলে একটি বিষয় স্পষ্টভাবে বোঝা যায়—আল্লাহ যখন বৃষ্টিকে রহমত ও কল্যাণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন, তখন তা মানুষের জীবন, কৃষি ও জীবিকার জন্য তাঁর অনুগ্রহ হিসেবে বর্ণিত হয়েছে। আল্লাহ বলেন:

﴿وَإِنْ مِنْ شَيْءٍ إِلَّا عِنْدَنَا خَزَائِنُهُ وَمَا نُنَزِّلُهُ إِلَّا بِقَدَرٍ مَعْلُومٍ﴾

“এমন কোনো বস্তু নেই যার ভাণ্ডার আমার কাছে নেই; আর আমি তা নির্দিষ্ট পরিমাণেই অবতীর্ণ করি।”— সূরা আল-হিজর, ১৫:২১

আবার আল্লাহ বলেন:

﴿وَأَنْزَلْنَا مِنَ السَّمَاءِ مَاءً بِقَدَرٍ فَأَسْكَنَّاهُ فِي الْأَرْضِ وَإِنَّا عَلَىٰ ذَهَابٍ بِهِ لَقَادِرُونَ﴾

“আর আমি আকাশ থেকে নির্ধারিত পরিমাণে পানি বর্ষণ করেছি। অতঃপর তা পৃথিবীতে সংরক্ষণ করেছি। আর আমি তা সরিয়ে নিতেও অবশ্যই সক্ষম।” — সূরা আল-মু’মিনূন, ২৩:১৮

এই আয়াত আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, বৃষ্টি কোনো স্বয়ংক্রিয় বা স্বাধীন শক্তির ফল নয়; আল্লাহ তাঁর জ্ঞান, হিকমত ও নির্ধারিত পরিমাণ অনুযায়ী বৃষ্টি বর্ষণ করেন।

বৃষ্টি শাস্তির মাধ্যম :  কুরআনে পূর্ববর্তী কিছু জাতির ওপর শাস্তি হিসেবে বৃষ্টি বা প্রবল বর্ষণের কথাও এসেছে। এ ক্ষেত্রে مَطَرٌ শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। লূত (আ.)-এর জাতির প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা বলেন:

﴿وَأَمْطَرْنَا عَلَيْهِمْ مَطَرًا ۖ فَانْظُرْ كَيْفَ كَانَ عَاقِبَةُ الْمُجْرِمِينَ﴾

“আর আমি তাদের ওপর এক বৃষ্টি বর্ষণ করেছিলাম। অতএব দেখো, অপরাধীদের পরিণতি কেমন হয়েছিল!” — সূরা আল-আ‘রাফ, ৭:৮৪

অন্যত্র আল্লাহ তাআলা বলেন:

﴿وَأَمْطَرْنَا عَلَيْهِمْ مَطَرًا فَسَاءَ مَطَرُ الْمُنْذَرِينَ﴾

“আর আমি তাদের ওপর বৃষ্টি বর্ষণ করেছিলাম। সতর্ককৃত লোকদের জন্য সেই বৃষ্টি কতই না নিকৃষ্ট ছিল!” — সূরা আন-নামল, ২৭:৫৮

ইতিহাসের শিক্ষা : বৃষ্টি ও পানি আল্লাহর বড় নিয়ামত হলেও মানুষের অবাধ্যতা ও সীমালঙ্ঘনের পরিণতিতে তা কখনো ধ্বংসের মাধ্যমেও পরিণত হতে পারে।

১. সাবা জাতির ঘটনা

সাবা জাতিকে আল্লাহ সমৃদ্ধ বাগান, কৃষি ও বাঁধসহ সুখী জীবন দিয়েছিলেন। কিন্তু তারা আল্লাহর নিয়ামতের অকৃতজ্ঞতা করেছিল। ফলে তাদের ওপর প্রবল বন্যা নেমে আসে। আল্লাহ বলেন:

﴿فَأَرْسَلْنَا عَلَيْهِمْ سَيْلَ الْعَرِمِ وَبَدَّلْنَاهُمْ بِجَنَّتَيْهِمْ جَنَّتَيْنِ ذَوَاتَيْ أُكُلٍ خَمْطٍ وَأَثْلٍ وَشَيْءٍ مِنْ سِدْرٍ قَلِيلٍ﴾

“অতঃপর আমি তাদের ওপর বাঁধভাঙা বন্যা প্রেরণ করলাম এবং তাদের দুটি উদ্যানের পরিবর্তে এমন দুটি উদ্যান দিলাম, যাতে ছিল তিক্ত ফল, ঝাউগাছ এবং অল্প কিছু কুলগাছ।” — সূরা সাবা, ৩৪:১৬

২. নূহ (আ.)-এর জাতি :

নূহ (আ.) তাঁর জাতিকে দীর্ঘকাল আল্লাহর দিকে আহ্বান করেছিলেন। কিন্তু তারা সত্য গ্রহণ করেনি এবং নাবীকে অস্বীকার করেছিল। শেষ পর্যন্ত আল্লাহ তাদের ওপর মহাপ্লাবন প্রেরণ করেন। আল্লাহ বলেন:

﴿فَفَتَحْنَا أَبْوَابَ السَّمَاءِ بِمَاءٍ مُنْهَمِرٍ ۝ وَفَجَّرْنَا الْأَرْضَ عُيُونًا فَالْتَقَى الْمَاءُ عَلَىٰ أَمْرٍ قَدْ قُدِرَ﴾

“অতঃপর আমি প্রবল বর্ষণের মাধ্যমে আকাশের দরজাসমূহ খুলে দিলাম। আর পৃথিবী থেকে ঝরনাসমূহ প্রবাহিত করলাম। অতঃপর পানি এমন এক বিষয়ে মিলিত হলো যা পূর্বনির্ধারিত ছিল।” — সূরা আল-কামার, ৫৪:১১–১২

নূহ আলাইহিস সালামের সম্প্রদায় ধ্বংস করার পর আল্লাহ তাআলা বলেন :

وَقِيلَ يَا أَرْضُ ابْلَعِي مَاءَكِ وَيَا سَمَاءُ أَقْلِعِي وَغِيضَ الْمَاءُ وَقُضِيَ الْأَمْرُ وَاسْتَوَتْ عَلَى الْجُودِيِّ وَقِيلَ بُعْدًا لِلْقَوْمِ الظَّالِمِينَ (44)

আর বলা হল, ‘হে যমীন, তুমি তোমার পানি চুষে নাও, আর হে আসমান, বিরত হও’। অতঃপর পানি কমে গেল এবং (আল্লাহর) সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হল, আর নৌকা জুদী পর্বতের উপর উঠল এবং ঘোষণা করা হল, ‘ধ্বংস যালিম কওমের জন্য’। [হুদ-৪৪]

বিঃদ্রঃ বোঝা গেল কখনো কখনো পানি কাফিরদের জন্য আল্লাহর আযাব হিসাবে বর্ষিত হয়।

খ. পানি—জীবনের উৎস ও রিজিক :

১. সৃষ্টির উৎস পানি  :  আল্লাহ পৃথিবীর সমস্ত জীবের জীবনধারণকে পানির সঙ্গে সম্পৃক্ত করেছেন।

আল্লাহ তাআলা বলেন:

﴿أَوَلَمْ يَرَ الَّذِينَ كَفَرُوا أَنَّ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ كَانَتَا رَتْقًا فَفَتَقْنَاهُمَا وَجَعَلْنَا مِنَ الْمَاءِ كُلَّ شَيْءٍ حَيٍّ ۖ أَفَلَا يُؤْمِنُونَ﴾

“যারা কুফরি করেছে তারা কি দেখে না যে আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী উভয়ই সংযুক্ত ছিল, অতঃপর আমি উভয়কে পৃথক করে দিলাম এবং পানি থেকে প্রত্যেক জীবন্ত বস্তুকে সৃষ্টি করলাম? তবুও কি তারা ঈমান আনবে না?”— সূরা আল-আম্বিয়া, ২১:৩০।

২. রিজিক ও খাদ্যের উৎস হল পানি :

আল্লাহ তাআলা বলেন :

وَهُوَ الَّذِي أَنْزَلَ مِنَ السَّمَاءِ مَاءً فَأَخْرَجْنَا بِهِ نَبَاتَ كُلِّ شَيْءٍ فَأَخْرَجْنَا مِنْهُ خَضِرًا نُخْرِجُ مِنْهُ حَبًّا مُتَرَاكِبًا وَمِنَ النَّخْلِ مِنْ طَلْعِهَا قِنْوَانٌ دَانِيَةٌ وَجَنَّاتٍ مِنْ أَعْنَابٍ وَالزَّيْتُونَ وَالرُّمَّانَ مُشْتَبِهًا وَغَيْرَ مُتَشَابِهٍ انْظُرُوا إِلَى ثَمَرِهِ إِذَا أَثْمَرَ وَيَنْعِهِ إِنَّ فِي ذَلِكُمْ لَآيَاتٍ لِقَوْمٍ يُؤْمِنُونَ (99)

আর তিনিই আসমান থেকে বর্ষণ করেছেন বৃষ্টি। অতঃপর আমি এ দ্বারা উৎপন্ন করেছি সব জাতের উদ্ভিদ। অতঃপর আমি তা থেকে বের করেছি সবুজ ডাল-পালা। আমি তা থেকে বের করি ঘন সন্নিবিষ্ট শস্যদানা। আর খেজুর বৃক্ষের মাথি থেকে (বের করি) ঝুলন্ত থোকা। আর (উৎপন্ন করি) আঙ্গুরের বাগান এবং সাদৃশ্যপূর্ণ ও সাদৃশ্যহীন যয়তুন ও আনার। দেখ তার ফলের দিকে, যখন সে ফলবান হয় এবং তার পাকার প্রতি। নিশ্চয় এতে নিদর্শন রয়েছে এমন কওমের জন্য যারা ঈমান আনে।  আল-আনআম : ৯৯।

মানুষকে নিজের খাদ্যের জন্য চিন্তা করতে আল্লাহ তাআলা বলেন:

﴿فَلْيَنْظُرِ الْإِنْسَانُ إِلَىٰ طَعَامِهِ ۝ أَنَّا صَبَبْنَا الْمَاءَ صَبًّا ۝ ثُمَّ شَقَقْنَا الْأَرْضَ شَقًّا ۝ فَأَنْبَتْنَا فِيهَا حَبًّا ۝ وَعِنَبًا وَقَضْبًا ۝ وَزَيْتُونًا وَنَخْلًا ۝ وَحَدَائِقَ غُلْبًا ۝ وَفَاكِهَةً وَأَبًّا ۝ مَتَاعًا لَكُمْ وَلِأَنْعَامِكُمْ﴾

“মানুষ যেন তার খাদ্যের দিকে লক্ষ্য করে। নিশ্চয়ই আমি প্রচুর পানি বর্ষণ করেছি। অতঃপর আমি জমিন বিদীর্ণ করেছি। তারপর তাতে উৎপন্ন করেছি শস্য, আঙুর, তাজা ঘাস, জলপাই, খেজুর, ঘন বাগান, ফলমূল ও পশুখাদ্য— তোমাদের ও তোমাদের পশুদের উপকারের জন্য।” — সূরা ‘আবাসা, ৮০:২৪–৩২

  • বৃষ্টির পানিই হল প্রকৃতপক্ষে ফল ফসল উৎপাদনের মৌলিক উপাদান।

৩. বৃষ্টি না হলে কী হয়?

বৃষ্টি না হলে মানুষের জীবনব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

  • কৃষি জমি শুকিয়ে যায়।
  • খাদ্য উৎপাদন কমে যায়।
  • পানীয় জলের সংকট দেখা দেয়।
  • মানুষ ও পশুপাখি পানির অভাবে কষ্ট পায়।
  • জীবনের স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যায়।

তাই বৃষ্টি প্রদানকারী সৃষ্টিকর্তাকে চিনে তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞ ও অনুগত হওয়া উচিত।

আল্লাহ তাআলা বলেন:

﴿يَا أَيُّهَا النَّاسُ اعْبُدُوا رَبَّكُمُ الَّذِي خَلَقَكُمْ وَالَّذِينَ مِنْ قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ ۝ الَّذِي جَعَلَ لَكُمُ الْأَرْضَ فِرَاشًا وَالسَّمَاءَ بِنَاءً وَأَنْزَلَ مِنَ السَّمَاءِ مَاءً فَأَخْرَجَ بِهِ مِنَ الثَّمَرَاتِ رِزْقًا لَكُمْ فَلَا تَجْعَلُوا لِلَّهِ أَنْدَادًا وَأَنْتُمْ تَعْلَمُونَ﴾

“হে মানুষ! তোমরা তোমাদের রবের ইবাদত করো, যিনি তোমাদের এবং তোমাদের পূর্ববর্তীদের সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারো। যিনি তোমাদের জন্য পৃথিবীকে করেছেন বিছানা এবং আকাশকে ছাদ করেছেন এবং আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করে তার মাধ্যমে তোমাদের জন্য বিভিন্ন ফলমূল রিজিক হিসেবে উৎপন্ন করেছেন। অতএব জেনে-বুঝে আল্লাহর সমকক্ষ স্থির করো না।” — সূরা আল-বাকারা, ২:২১–২২

৪. বৃষ্টি সম্পর্কে একজন মুমিনের সতর্কতা :

বৃষ্টি হওয়া সম্পূর্ণরূপে আল্লাহর রহমত ও ইচ্ছার অধীন। প্রাকৃতিক কোনো ঘটনা বা নক্ষত্রকে স্বাধীনভাবে বৃষ্টির কারণ মনে করা ইসলামী আকীদার পরিপন্থী। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

«أَصْبَحَ مِنْ عِبَادِي مُؤْمِنٌ بِي وَكَافِرٌ، فَأَمَّا مَنْ قَالَ: مُطِرْنَا بِفَضْلِ اللَّهِ وَرَحْمَتِهِ، فَذَلِكَ مُؤْمِنٌ بِي كَافِرٌ بِالْكَوْكَبِ، وَأَمَّا مَنْ قَالَ: مُطِرْنَا بِنَوْءِ كَذَا وَكَذَا، فَذَلِكَ كَافِرٌ بِي مُؤْمِنٌ بِالْكَوْكَبِ»

অর্থ: “আমার বান্দাদের মধ্যে কেউ আমার প্রতি ঈমানদার হয়ে সকাল করেছে এবং কেউ আমার প্রতি অস্বীকারকারী হয়ে সকাল করেছে। যে ব্যক্তি বলেছে, ‘আল্লাহর অনুগ্রহ ও রহমতে আমরা বৃষ্টি পেয়েছি’, সে আমার প্রতি ঈমানদার এবং নক্ষত্রের প্রতি অস্বীকারকারী। আর যে ব্যক্তি বলেছে, ‘অমুক নক্ষত্রের কারণে আমরা বৃষ্টি পেয়েছি’, সে আমার প্রতি অস্বীকারকারী এবং নক্ষত্রের প্রতি বিশ্বাসী।”— সহীহ বুখারী, হাদীস ১০৩৮; সহীহ মুসলিম, হাদীস ৭১।

অতএব বলা উচিত:

مُطِرْنَا بِفَضْلِ اللَّهِ وَرَحْمَتِهِ

“আল্লাহর অনুগ্রহ ও রহমতে আমরা বৃষ্টি পেয়েছি।”

 সুতরাং নক্ষত্র, রাশি বা অন্য কোনো সৃষ্টিকে বৃষ্টির স্বাধীন কার্যকর কারণ মনে করা যাবে না।

৫. বৃষ্টির জন্য প্রার্থনা :  বৃষ্টি কামনা করার সময় রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর একটি দুআ পড়তেন। সেটি হল-

اللَّهُمَّ اسْقِنَا غَيْثًا مُغِيثًا، مَرِيئًا مَرِيعًا، نَافِعًا غَيْرَ ضَارٍّ، عَاجِلًا غَيْرَ آجِلٍ

উচ্চারণ ঃ আল্লাহুম্মাস্‌কিনা গাইসান মুগীসান, মারীআন মারীআন, নাফি‘আন গাইরা যার্‌রিন, ‘আজিলান গাইরা আজিলিন।

অর্থ: হে আল্লাহ! আমাদের এমন বৃষ্টি দান করুন, যা সাহায্যকারী, উপকারী, সুস্বাদু ও কল্যাণকর; ক্ষতিকর নয়; দ্রুত দান করুন, বিলম্বিত করবেন না।” — সুনান আবূ দাঊদ, হাদীস ১১৬৯। হাদীসটি সহীহ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

৬. বৃষ্টি হলে যে দুআ পড়তে হয় : বৃষ্টি শুরু হলে রাসূলুল্লাহ ﷺ বলতেন-

اللَّهُمَّ صَيِّبًا نَافِعًا

উচ্চারণ : আল্লাহুম্মা সাইয়েবান নাফিআন

অর্থ: “হে আল্লাহ! উপকারী বৃষ্টি বর্ষণ করুন।” — সহীহ বুখারী, হাদীস ১০৩২।

৭. বৃষ্টি হয়ে যাওয়ার পর : বৃষ্টি পাওয়ার পর বলতে হয়

مُطِرْنَا بِفَضْلِ اللَّهِ وَرَحْمَتِهِ

উচ্চারণ : মুতিরনা বেফাযলিল্লাহে ওয়া রমমাতিহী।

অর্থ: “আল্লাহর অনুগ্রহ ও রহমতে আমাদের ওপর বৃষ্টি বর্ষিত হয়েছে।” [”— সহীহ বুখারী, হাদীস ১০৩৮, ৮৪৬]। এটি রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর শেখানো ঈমানসম্মত বক্তব্য। এর মাধ্যমে বান্দা বৃষ্টির প্রকৃত দাতা আল্লাহকে স্বীকার করে।

৮. বৃষ্টি অতিরিক্ত হয়ে গেলে :

যখন অতিরিক্ত বৃষ্টি হয়ে ক্ষতি বা দুর্ভোগ সৃষ্টি হয়, তখন রাসূলুল্লাহ ﷺ দুআ করতেন:

اللَّهُمَّ حَوَالَيْنَا وَلَا عَلَيْنَا، اللَّهُمَّ عَلَى الْآكَامِ وَالظِّرَابِ، وَبُطُونِ الْأَوْدِيَةِ، وَمَنَابِتِ الشَّجَرِ

 উচ্চারণ ঃ আল্লাহুম্মা হাওয়ালাইনা ওয়ালা আলাইনা, আল্লাহুম্মা আলাল-আকামি ওয়ায-যিরাবি, ওয়া বুতূনিল-আওদিয়াতি, ওয়া মানাবিতিশ-শাজারি।

অর্থ: “হে আল্লাহ! আমাদের চারপাশে বৃষ্টি বর্ষণ করুন, আমাদের ওপর নয়। হে আল্লাহ! টিলা-পর্বত, উঁচু ভূমি, উপত্যকার তলদেশ এবং গাছপালার উৎপত্তিস্থলে বৃষ্টি বর্ষণ করুন।” — সহীহ বুখারী, হাদীস ১০১৪; সহীহ মুসলিম, হাদীস ৮৯৭।

৯. প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে শিক্ষা :

আমাদের দেশে সংঘটিত বিভিন্ন দুর্যোগের পেছনে মানুষের দায়িত্বহীন কর্মকাণ্ড এবং পরিবেশের ক্ষতিও অনেক ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে। তাই দুর্যোগের সময় শুধু আতঙ্কিত না হয়ে আত্মসমালোচনা, তওবা, দুআ এবং বাস্তব সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত।

১০. উমর (রা.)-এর সময় মদিনায় ভূমিকম্প : উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর সময় মদিনায় ভূমিকম্প হলে তিনি মানুষকে সতর্ক করেছিলেন। বর্ণনায় এসেছে:

زُلْزِلَتِ الْمَدِينَةُ عَلَى عَهْدِ عُمَرَ حَتَّى اصْطَفَقَتِ السُّرُرُ، فَخَطَبَ عُمَرُ النَّاسَ فَقَالَ: أَحْدَثْتُمْ، لَقَدْ عَجَّلْتُمْ، لَئِنْ عَادَتْ لَأَخْرُجَنَّ مِنْ بَيْنِ ظَهْرَانَيْكُمْ

অর্থ: “উমর (রা.)-এর যুগে মদিনায় ভূমিকম্প হয়েছিল, এমনকি খাটগুলোও কেঁপে উঠেছিল। তখন উমর (রা.) লোকদের উদ্দেশে ভাষণ দিয়ে বললেন: ‘তোমরা নতুন কিছু (গুনাহ/অন্যায়) ঘটিয়েছ; তোমরা তাড়াহুড়ো করে ফেলেছ। যদি আবার ভূমিকম্প হয়, তবে আমি অবশ্যই তোমাদের মধ্য থেকে বেরিয়ে যাব।’” — মুসান্নাফ ইবনু আবী শাইবাহ-8335 ; সুনান আল-বায়হাকী আল-কুবরা, হাদীস-6377, মাওকুফ সহীহ।

এটি নবী -এর হাদীস নয়; সাহাবি উমর (রা.)-এর একটি আসার—এ কথা উল্লেখ করা জরুরি।

১১. দুর্যোগের সময় কুরআনের সতর্কবার্তা :

আল্লাহ তাআলা বলেন:

﴿أَوَلَا يَرَوْنَ أَنَّهُمْ يُفْتَنُونَ فِي كُلِّ عَامٍ مَرَّةً أَوْ مَرَّتَيْنِ ثُمَّ لَا يَتُوبُونَ وَلَا هُمْ يَذَّكَّرُونَ﴾

“তারা কি দেখে না যে, প্রতি বছর একবার বা দুবার তাদের পরীক্ষা করা হয়? এরপরও তারা তওবা করে না এবং উপদেশ গ্রহণ করে না।” — সূরা আত-তাওবা, ৯:১২৬

দুর্যোগ একজন মুমিনের জন্য আত্মসমালোচনা, তওবা ও আল্লাহর দিকে ফিরে যাওয়ার একটি উপলক্ষ হতে পারে।

১২. দুর্যোগে আমাদের করণীয় :

আমাদের আশপাশে এমন অনেক মানুষ রয়েছেন যারা সবকিছু হারিয়ে ফেলেছেন—

  • কারও ঘরবাড়ি নষ্ট হয়েছে;
  • কারও ঘরের আসবাবপত্র পানিতে ভেসে গেছে;
  • কারও ফসল নষ্ট হয়েছে;
  • কারও জীবিকার সমস্ত পথ বন্ধ হয়ে গেছে;
  • অনেকে খাদ্য, পানি ও আশ্রয়ের সংকটে পড়েছেন।

তাই আমাদের সামর্থ্য অনুযায়ী তাদের সাহায্য করতে হবে। তাদের প্রয়োজনীয় জিনিস পৌঁছে দিতে হবে এবং তাদের জন্য দুআ করতে হবে।

আমাদের করণীয়:

১. দুর্গতদের যথাসম্ভব সাহায্য করা।

২. তাদের জন্য আল্লাহর কাছে দুআ করা।

৩. সরকারি ও প্রশাসনিক সতর্কবার্তাকে অবহেলা না করা।

৪. অপ্রয়োজনীয় ভ্রমণ ও ঝুঁকিপূর্ণ যাতায়াত থেকে বিরত থাকা।

৫. বন্যা, ভূমিধস বা অন্য কোনো দুর্যোগের সময় নিরাপত্তাকে গুরুত্ব দেওয়া।

৬. একই সঙ্গে আল্লাহর কাছে তওবা, ইস্তিগফার ও দুআ করা।

উপসংহার : বৃষ্টি কখনো আল্লাহর রহমত, কখনো পরীক্ষা এবং কখনো মানুষের জন্য সতর্কবার্তার উপলক্ষ হতে পারে। তবে কোনো নির্দিষ্ট দুর্যোগকে নিশ্চিতভাবে “আল্লাহর শাস্তি” বলে ঘোষণা করার ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। কারণ কোনো নির্দিষ্ট ঘটনা কেন ঘটেছে—তার চূড়ান্ত গায়েবি কারণ আল্লাহই সর্বাধিক জানেন।

একজন মুমিনের কর্তব্য হলো—

  • নিয়ামত এলে শুকরিয়া আদায় করা,
  • বিপদ এলে ধৈর্য ধারণ করা,
  • নিজের ভুলের জন্য তওবা করা,
  • আল্লাহর কাছে সাহায্য চাওয়া,
  • এবং বিপদগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো। আল্লাহ আমাদের বৃষ্টিকে রহমত, কল্যাণ ও জীবনের উপকরণ হিসেবে দান করুন; অতিবৃষ্টি, বন্যা, ভূমিধস ও সব ধরণের ক্ষতি থেকে আমাদের রক্ষা করুন এবং সকল বিপদগ্রস্ত মানুষকে সাহায্য করুন। آمين

Leave a Reply