আমানাত : হিফাযাত ও খিয়ানাত

           লেখক : মোঃ তাজাম্মুল হক সালাফী

  • ভুমিকা :

সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য, যিনি উচ্চ মর্যাদার অধিকারী, আসমান ও যমীনের পরিচালক। তিনি তাঁর বান্দাদের প্রতি বিভিন্ন ধরণের রহমত ও বরকত দিয়ে অনুগ্রহ করেছেন। তিনি শরিয়ত বা জীবন বিধান তৈরি করেছেন এবং রাসুলদেরকে কিতাব দিয়ে পাঠিয়েছেন। অতঃপর তিনি তাদেরকে আমানত রক্ষা করার নির্দেশ দিয়েছেন এবং বিশ্বাসঘাতকতা ও সব ধরণের খিয়ানত করতে নিষেধ করেছেন। সর্বশেষ নাবী ও রসূল মুহাম্মাদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর বাণী আমানতের সঙ্গে পৌঁছে দিয়েছেন, আমানত আদায় করেছেন, উম্মতকে নসিহত করেছেন, অন্ধকার দূর করেছেন এবং আল্লাহর পথে সঠিকভাবে পরিচালিত করেছেন। তিনি আমাদেরকে স্পষ্ট দ্বীনের উপর রেখে েগছেন। হাদীসে বর্ণিত হয়েছে-

قَدْ تَرَكْتُكُمْ عَلَى الْبَيْضَاءِ لَيْلُهَا كَنَهَارِهَا، لَا يَزِيغُ عَنْهَا بَعْدِي إِلَّا هَالِكٌ، مَنْ يَعِشْ مِنْكُمْ فَسَيَرَى اخْتِلَافًا كَثِيرًا، فَعَلَيْكُمْ بِمَا عَرَفْتُمْ مِنْ سُنَّتِي، وَسُنَّةِ الْخُلَفَاءِ الرَّاشِدِينَ الْمَهْدِيِّينَ، عَضُّوا عَلَيْهَا بِالنَّوَاجِذِ، وَعَلَيْكُمْ بِالطَّاعَةِ، وَإِنْ عَبْدًا حَبَشِيًّا، فَإِنَّمَا الْمُؤْمِنُ كَالْجَمَلِ الْأَنِفِ، حَيْثُمَا قِيدَ انْقَادَ

ইরবায ইবনু সারিয়াহ (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে এমন হৃদয়গ্রাহী নাসীহাত করেন যে, তাতে (আমাদের) চোখগুলো অশ্রু ঝরালো এবং অন্তরসমূহ প্রকম্পিত হল। আমরা বললাম, হে আল্লাহ্‌র রাসূল! এতো যেন নিশ্চয়ই বিদায়ী ভাষণ। অতএব আপনি আমাদের থেকে কি প্রতিশ্রুতি নিবেন (আদেশ দিবেন)? তিনি বলেনঃ আমি তোমাদের আলোকিত দ্বীনের উপর রেখে যাচ্ছি, তার রাত তার দিনের মতই (উজ্জ্বল)। আমার পরে নিজেকে ধ্বংসকারীই কেবল এ দ্বীন ছেড়ে বিপথগামী হবে।

তোমাদের মধ্যে যে বেঁচে থাকবে সে অচিরেই অনেক মতবিরোধ দেখতে পাবে। অতএব তোমাদের উপর তোমাদের নিকট পরিচিত আমার আদর্শ এবং হিদায়াতপ্রাপ্ত খুলাফায়ে রাশিদীনের আদর্শ অনুসরণ করা অবশ্য কর্তব্য। তোমরা তা শক্তভাবে দাঁত দিয়ে আকড়ে ধরে থাকবে। তোমরা অবশ্যই আনুগত্য করবে, যদি হাবশী গোলামও (তোমাদের নেতা নিযুক্ত) হয়। কেননা মুমিন ব্যাক্তি হচ্ছে নাকে  লাগাম পরানো উটতুল্য। লাগাম ধরে যে দিকেই তাকে টানা হয়, সে দিকেই যেতে বাধ্য হয় (ইবনু মাজাহ-৪৩, সহীহ-আলবানী)।

ইসলামে আমানতদারিতার (বিশ্বস্ততার) গুরুত্ব অপরিসীম। একজন মুমিন ততক্ষণ পর্যন্ত প্রকৃত মুমিন হতে পারে না, যতক্ষণ না সে আমানতদার হয়। কারণ আল্লাহর রসূল স্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন :

لَا إِيمَانَ لِمَنْ لَا أَمَانَةَ لَهُ، وَلَا دِينَ لِمَنْ لَا عَهْدَ لَهُ

যার মধ্যে আমানতদারিতা নেই, তার কোনো ইমান নেই; আর যে অঙ্গীকার রক্ষা করে না, তার কোনো দ্বীন (ধর্ম) নেই (মুসনাদ আহামাদ-১২৩৮৩, সহীহুল জামি-৭১৭৯।

  • শাব্দিক অর্থ :

 আমানত” (أمانة) শব্দটি একটি তিন অক্ষরের মূল শব্দ (أَ مِ نَ – আলিফ, মিম, নুন) থেকে এসেছে। এর কয়েকটি অর্থ বর্ণিত হয়েছে-

১) নিরাপত্তা ও শান্তি (الأمن والأمان) : অর্থাৎ মানুষের স্বস্তি, মানসিক শান্তি এবং ভয়ভীতি দূর হওয়ার অনুভূতি।

২) বিশ্বাসঘাতকতার বিপরীত (نقيض الخيانة) : একজন বিশ্বস্ত (আমীন) মানুষ হলেন তিনি, যাকে সবাই বিশ্বাস করে এবং যার কাছ থেকে মানুষ নিজের জীবন বা সম্পদের ব্যাপারে কোনো ভয় পায় না।

৩) সংরক্ষিত বস্তু (الشيء المحفوظ) : কোনো জিনিস বা গচ্ছিত সম্পদ (ওয়াদিয়া) যখন কারও কাছে সুরক্ষার জন্য রাখা হয়, তখন তাকেও আমানত বলা হয়।

  • পারিভাষিক অর্থ :

আমাদের জীবন ও ধর্মে আমানতের ধারণাটি অনেক ব্যাপক। এটি কেবল টাকা-পয়সা বা সম্পদ পাহারা দেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এর আসল সংজ্ঞা হলো-

১) যে কোনো অধিকার রক্ষা ও আদায় করা (كل حق لزمك حفظه وأداؤه) : সেই অধিকারটি মহান আল্লাহর হোক কিংবা মানুষের হোক, তা যত্ন সহকারে পালন করা।

২) দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন (رعاية الواجبات) : যেমন—ঠিকমতো সালাত আদায় করা , সিয়াম রাখা এবং কাউকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি বা ওয়াদা পূরণ করা।

৩) গোপনীয়তা রক্ষা করা (حفظ الأسرار) : বন্ধুরা আপনাকে যে গোপন কথা বা বিশ্বাসের কথা জানায়, তা নিজের কাছে লুকিয়ে রাখা এবং অন্য কারও কাছে প্রকাশ না করা।

  • আমানাতের সংজ্ঞা আব্দুল্লাহ ইবনে মাসঊদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর ভাষায় :

وَقَالَ ابْنُ مَسْعُودٍ: الْأَمَانَةُ أَدَاءُ الصلاة وَإِيتَاءُ الزَّكَاةِ وَصَوْمُ رَمَضَانَ وَحَجُّ الْبَيْتِ وَصِدْقُ الْحَدِيثِ وَقَضَاءُ الدَّيْنِ وَالْعَدْلُ فِي الْمِكْيَالِ وَالْمِيزَانِ، وَأَشَدُّ مِنْ هَذَا كُلِّهِ الْوَدَائِعُ. وَقَالَ مجاهد: الأمانة الفرائض.

ইবনে মাসউদ (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন : আমানত হলো—ঠিকমতো সলাত আদায় করা , যাকাত দেওয়া, রমজানেরি সিয়াম রাখা, আল্লাহর ঘরের (কাবার) হজ করা, সত্য কথা বলা, ঋণ বা ধার পরিশোধ করা এবং ব্যবসা-বাণিজ্যে মাপ ও ওজনে সুবিচার করা (কম না দেওয়া)। আর এই সবকিছুর চেয়েও আরও কঠিন বা গুরুতর বিষয় হলো—মানুষের গচ্ছিত সম্পদ বা আমানত রক্ষা করা।”

এবং মুজাহিদ (রাহেমাহুল্লাহু) বলেন : আমানত হলো (আল্লাহ তাআলার দেওয়া) সমস্ত ফরয বা বাধ্যতামূলক দায়িত্বসমূহ(তাফসীর বাগাবী : সূরা আহযাবের ৬৮-৭২ নং আয়াতের তাফসীর দেখুন)। ।”

এই উক্তিটি থেকে বোঝা যায় যে, আমানত বিষয়টি মূলত তিনটি প্রধান ভাগে বিভক্ত

১) আল্লাহর প্রতি দায়িত্ব : সলাত, সিয়াম, যাকাত ও হজের মতো ফরয ইবাদতগুলো ঠিকঠাক পালন করা আল্লাহর আমানত রক্ষা করার নাম।

২) মানুষের সাথে সদাচারণ : সত্য কথা বলা, কারও কাছ থেকে ধার করা টাকা সময়মতো ফেরত দেওয়া এবং ব্যবসার সময় ওজনে কম না দেওয়া মানুষের সাথে আমানতদারিতা।

৩) গচ্ছিত জিনিসের সুরক্ষা : ইবনে মাসউদ (রা.) এর মতে, সবচেয়ে কঠিন আমানত হলো— কেউ যখন বিশ্বাস করে নিজের টাকা, গয়না বা মূল্যবান কোনো জিনিস আপনার কাছে জমা রাখে, তা একদম সুরক্ষিতভাবে ফেরত দেওয়া।

  • আব্দুল্লাহ বিন আমর বিনিল আস রাযিযাল্লাহু আনহু আমানাতের ব্যাখ্যায় বলেছেন-

وَقَالَ عَبْدُ اللَّهِ بْنُ عَمْرِو بْنِ الْعَاصِ: أَوَّلُ مَا خَلَقَ اللَّهُ مِنَ الْإِنْسَانِ فَرْجَهُ وَقَالَ هَذِهِ أَمَانَةٌ اسْتَوْدَعْتُكَهَا، فَالْفَرْجُ أَمَانَةٌ وَالْأُذُنُ أَمَانَةٌ وَالْعَيْنُ أَمَانَةٌ وَالْيَدُ أَمَانَةٌ وَالرِّجْلُ أَمَانَةٌ وَلَا إِيمَانَ لِمَنْ لَا أَمَانَةَ لَهُ.

আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন : আল্লাহ তাআলা মানুষের মধ্যে সর্বপ্রথম যে জিনিসটি সৃষ্টি করেছেন তা হলো তার গুপ্তাঙ্গ (লজ্জা স্থান)। এরপর তিনি বললেন, ‘এটি একটি আমানত, যা আমি তোমার কাছে গচ্ছিত রাখলাম।’ অতএব, গুপ্তাঙ্গ একটি আমানত, কান একটি আমানত, চোখ একটি আমানত, হাত একটি আমানত এবং পা-ও একটি আমানত। আর যার মধ্যে আমানতদারিতা নেই, তার কোনো ঈমান নেই।”

বোঝা গেল-

১) শরীর আল্লাহর দেওয়া আমানত : আমাদের চোখ, কান, হাত, পা এবং পুরো শরীর আমাদের নিজস্ব সম্পত্তি নয়। এগুলো মহান আল্লাহ আমাদের ব্যবহার করার জন্য একটি ‘আমানত’ বা উপহার হিসেবে দিয়েছেন।

২) সঠিক ব্যবহার করা : আমানত রক্ষার অর্থ হলো—চোখ দিয়ে ভালো জিনিস দেখা, কান দিয়ে ভালো কথা শোনা, হাত-পা দিয়ে কারও ক্ষতি না করা এবং লজ্জাস্থানকে যেকোনো ধরনের অবৈধ বা হারাম কাজ থেকে পবিত্র রাখা।

৩) ঈমানের সাথে সম্পর্ক : উক্তির শেষ অংশটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, যে ব্যক্তি আল্লাহর দেওয়া এই অঙ্গগুলোর সঠিক ব্যবহার করে না বা আমানত রক্ষা করে না, তার ঈমান বা বিশ্বাস পরিপূর্ণ নয়। (তাফসীর বাগাবী : সূরা আহযাবের ৬৮-৭২ নং আয়াতের তাফসীর দেখুন)।

সূধী শোতৃমণ্ডলী! আমানতের পরিধি আমাদের ধারণার চেয়েও অনেক বেশি ব্যাপক। আমরা সাধারণত মনে করি আমানত মানে শুধু মানুষের জমা রাখা ধন-সম্পদ, কিন্তু বিষয়টি কেবল তার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তাই যে ব্যক্তি তার সলাতে অবহেলা করল, সে আমানতের খেয়ানত (বিশ্বাসভঙ্গ) করল। যে ব্যক্তি রমযান মাসের িসয়াম পালনে অবহেলা করল, সেও আমানতের খেয়ানত করল। এমনকি যে ব্যক্তি ফরয গোসলে (অপবিত্রতা থেকে পবিত্র হওয়ার গোসল) অবহেলা করল, সেও আমানতের খেয়ানত করল।

  • আমানাতের প্রকারভেদ :

আমানাত দুই প্রকার ১ ) আল্লাহর আমানত এবং ২) মানুষের আমানাত।

১) মহান আল্লাহর আমানত (সর্বোচ্চ আমানত)। এটি দ্বীন বা ধর্মের মূল ভিত্তি। এর অর্থ হলো—আল্লাহ তাআলো আমাদের উপর যে সমস্ত ইবাদত ফরয (আবশ্যিক) করেছেন, তা মেনে চলা এবং যা কিছু নিষেধ করেছেন, তা থেকে দূরে থাকা। এর মধ্যে রয়েছে-

ক) শরীয়তের বিধান ও দায়িত্বের আমানত : কোনো রকম ফাঁকি না দিয়ে সালাত, অযু , সিয়াম) এবং যাকাত সঠিকভাবে আদায় করা। মহান আল্লাহ বলেন –

إِنَّا عَرَضْنَا الْأَمَانَةَ عَلَى السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَالْجِبَالِ فَأَبَيْنَ أَنْ يَحْمِلْنَهَا وَأَشْفَقْنَ مِنْهَا وَحَمَلَهَا الْإِنْسَانُ إِنَّهُ كَانَ ظَلُومًا جَهُولًا (72)

আমি আসমান, যমিন ও পর্বতমালার সামনে এই আমানত পেশ করেছিলাম, কিন্তু তারা তা বহন করতে অস্বীকার করল এবং এতে ভীত হলো; আর মানুষ তা বহন করল। নিশ্চয়ই সে বড়ই জালেম ও অজ্ঞ।” (সূরা আল-আহযাব: ৭২) — (ওলামায়ে কেরাম বা বিদ্বানেরা এখানে “আমানত” বলতে দ্বীন এবং আল্লাহর ফরয বিধানগুলোকে বুঝিয়েছেন)।

খ) অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের আমানত : আল্লাহ আপনাকে চোখ, কান, হাত ও পা আমানত হিসেবে দিয়েছেন। এগুলোর সঠিক হেফাযাত বা রক্ষা করার উপায় হলো—এগুলোকে কোনো হারাম বা নিষিদ্ধ কাজে ব্যবহার না করা ( যেমন: হারাম কিছুর দিকে না তাকানো কিংবা গীবত বা পরনিন্দা না শোনা)। মহান আল্লাহ বলেন –

إِنَّ السَّمْعَ وَالْبَصَرَ وَالْفُؤَادَ كُلُّ أُولَئِكَ كَانَ عَنْهُ مَسْئُولًا (36)

“নিশ্চয়ই কান, চোখ ও অন্তরের—এদের প্রত্যেকটি সম্পর্কে (কিয়ামতের দিন) কৈফিয়ত তলব করা হবে।” (সূরা আল-ইসরা: ৩৬)।

২)  বান্দার হক বা মানুষের অধিকারের আমানত এটি মানুষের মধ্যকার পারস্পরিক সম্পর্ককে সুশৃঙ্খল করে, যাতে সমাজ শান্তিতে চলতে পারে। এর অনেকগুলো রূপ বা ধরণ রয়েছে, যার মধ্যে প্রধানগুলো হল-

ক) গচ্ছিত সম্পদ ও অর্থের আমানত (امانة الودائع والأموال):  মানুষ নিরাপদে রাখার জন্য কোনো মানুষের কাছে যে সমস্ত জিনিসপত্র বা টাকা-পয়সা গচ্ছিত রাখে তা ফেরত দেওয়া অথবা কোনো টালবাহানা না করে সময়মতো ঋণ পরিশোধ করা। মহান আল্লাহ বলেন –

إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُكُمْ أَنْ تُؤَدُّوا الْأَمَانَاتِ إِلَى أَهْلِهَا وَإِذَا حَكَمْتُمْ بَيْنَ النَّاسِ أَنْ تَحْكُمُوا بِالْعَدْلِ إِنَّ اللَّهَ نِعِمَّا يَعِظُكُمْ بِهِ إِنَّ اللَّهَ كَانَ سَمِيعًا بَصِيرًا (58)

 নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদেরকে আদেশ দিচ্ছেন যে, তোমরা আমানতসমূহ তাদের মালিকদের কাছে ফেরত দাও। যখন মানুুষের মধ্যে ফায়সালা করবে, তখন ইনসাফের সঙ্গে ফায়সালা করো। নিশ্চয় আল্লাহ খুব সুন্দর তোমাদেরকে নসীহত করছেন এবং নিশ্চয় আল্লাহ সব কিছু শোনেন এবং সব কিছু দেখেন। সূরা আন-নিসা: ৫৮

নাবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন :

أَدِّ الْأَمَانَةَ إِلَى مَنِ ائْتَمَنَكَ، وَلَا تَخُنْ مَنْ خَانَكَ

যে তোমার নিকটে যে আমানাত রেখেছে তার আমানত তাকে ফিরিয়ে দাও, আর যে তোমার সাথে খিয়ানাত বা বিশ্বাসঘাতকতা করেছে তুমি তার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করো না (আবূ দাঊদ-৩৫৩৪)।

খ) দায়িত্ব ও পদের আমানত:  (أمانة المسؤولية والولاية) একজন চাকুরিজীবী বা কর্মকর্তা তার দায়িত্ব সততার সাথে পালন করবেন। যোগ্যতাকে বাদ দিয়ে নিজের পদের অপব্যবহার করে ঘুষ নেওয়া কিংবা স্বজনপ্রীতি করবেন না। প্রখ্যাত সাহাবী আবু যার (রাযিয়াল্লাহু আনহু) যখন রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে একটি পদের (নেতৃত্বের) আবেদন করলেন, তখন নাবীজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর কাঁধে হাত রেখে বললেন-

يَا أَبَا ذَرٍّ، إِنَّكَ ضَعِيفٌ، وَإِنَّهَا أَمَانَةُ، وَإِنَّهَا يَوْمَ الْقِيَامَةِ خِزْيٌ وَنَدَامَةٌ، إِلَّا مَنْ أَخَذَهَا بِحَقِّهَا، وَأَدَّى الَّذِي عَلَيْهِ فِيهَا

“হে আবু যার! নিশ্চয়ই তুমি দুর্বল, আর এটি (পদ বা দায়িত্ব) হলো একটি আমানত। আর কেয়ামতের দিন এটি হবে চরম অপমান ও অনুশোচনার কারণ। তবে সেই ব্যক্তি ছাড়া, যে এটি সঠিক যোগ্যতার সাথে গ্রহণ করেছে এবং এর ভেতরের অর্পিত দায়িত্ব ঠিকঠাক আদায় করেছে  (সহীহ মুসলিম-১৮২৫)।”

গ) মজলিস ও গোপন কথার আমানত  (أمانة المجالس والأسرار) : কোনো ব্যক্তি যদি আপনাকে বিশ্বাস করে তার কোনো ব্যক্তিগত গোপন কথা বলে, অথবা আপনাদের মাঝে কোনো বিশেষ আলোচনা হয়, তবে তা অন্যের কাছে ফাঁস করা বা ছড়িয়ে দেওয়া জায়েজ বা বৈধ নয়।

রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন-

إِذَا حَدَّثَ الرَّجُلُ بِالْحَدِيثِ ثُمَّ الْتَفَتَ فَهِيَ أَمَانَةٌ

কোনো ব্যক্তি যখন কোনো কথা বলার পর (ডানে-বামে) তাকায়, তবে সেই কথাটি একটি আমানত (হয়ে যায়)। আবূ দাউদ-৪৮৬৮ হাসান-আলবানী।

ঘ) বেচাকেনা ও ব্যবসার আমানত  (أمانة البيع والتجارة)  : ক্রেতাদের সাথে কোনো রকম প্রতারণা বা ধোঁকাবাজি না করা এবং পণ্যের কোনো ত্রুটি বা খুঁত থাকলে তা লুকিয়ে না রেখে সততার সাথে স্পষ্ট করে বলে দেওয়া। নাবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন-

إِنَّ التُّجَّارَ يُبْعَثُونَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ فُجَّاراً إِلَّا من اتَّقى وَبَرَّ وصَدَقَ

কিয়ামতের দিন ব্যবসায়ীদেরকে পাপাচারী হিসেবে পুনরুত্থিত করা হবে—তবে তারা ছাড়া, যারা আল্লাহকে ভয় করত, সৎকর্ম করত এবং সত্যবাদী ছিল (সহীহা-৯৯৪)। বোঝা গেল যে, ব্যসায়ীরা সাধারণত আমানত রক্ষাকারী হয় না। তবে যারা তাকওয়া অবলম্বনকারী, সৎকর্মশীল, সত্যবাদী ও আমানাতদার তারা কিয়ামতের দিন মুক্ত পাবে।

( পরিবার ও সন্তানদের আমানত (أمانة الأسرة والأولاد) : সন্তানদের সৎ ও আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা, এবং স্বামী কর্তৃক স্ত্রীর অধিকার রক্ষা করা ও স্ত্রী কর্তৃক স্বামীর ঘর-সংসারের হেফাযত করা। আল্লাহর রাসূল (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন-

أَلَا كُلُّكُمْ رَاعٍ، وَكُلُّكُمْ مَسْئُولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ، فَالْأَمِيرُ الَّذِي عَلَى النَّاسِ رَاعٍ، وَهُوَ مَسْئُولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ، وَالرَّجُلُ رَاعٍ عَلَى أَهْلِ بَيْتِهِ، وَهُوَ مَسْئُولٌ عَنْهُمْ، وَالْمَرْأَةُ رَاعِيَةٌ عَلَى بَيْتِ بَعْلِهَا وَوَلَدِهِ، وَهِيَ مَسْئُولَةٌ عَنْهُمْ، وَالْعَبْدُ رَاعٍ عَلَى مَالِ سَيِّدِهِ وَهُوَ مَسْئُولٌ عَنْهُ، أَلَا فَكُلُّكُمْ رَاعٍ، وَكُلُّكُمْ مَسْئُولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ

তোমাদের প্রত্যেকেই এক একজন দায়িত্ববান এবং প্রত্যেকেই তার অধীনস্থদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। আমীর বা নেতা তার অধীনস্থ লোকদের উপর দায়িত্ববান এবং সে তাদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। প্রত্যেক ব্যক্তি তার পরিবারের লোকদের উপর দায়িত্বশীল, সে তা সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। স্ত্রী স্বীয় স্বামীর বাড়ী ও সন্তানের উপর দায়িত্ববান, সে সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। গোলাম তার মুনিবের মাল-সম্পদের উপর দায়িত্ববান, সে সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। ওহে! তোমাদের প্রত্যেকেই (স্ব-স্ব স্থানে) একজন দায়িত্ববান এবং তোমাদের প্রত্যেকেই তার অধীনস্থদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে  (মুসলিম-১৮২৯)।

  • আমানাত হিফাযাত করার ফযীলত :

) আল্লাহর সরাসরি আদেশ পালন করা : আমানত রক্ষা করা মহান আল্লাহর একটি সরাসরি নির্দেশ। তিনি মুমিনদের (বিশ্বাসীদের) জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে এটি মেনে চলার আদেশ দিয়েছেন। মহান আল্লাহ বলেন-

﴿إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُكُمْ أَنْ تُؤَدُّوا الْأَمَانَاتِ إِلَىٰ أَهْلِهَا﴾

অর্থ : নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দিচ্ছেন যে, তোমরা যেন আমানতসমূহ তার মালিকদের কাছে ফেরত দাও[সূরা আন-নিসা: ৫৮] ।”

) আমানাত রক্ষা করা নাবী এবং সত্যবাদী মুমিনদের গুণ :

জগতের সকল নবী-রাসূলগণ আমানতদার বা পরম বিশ্বস্ত ছিলেন। আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) নবুয়ত পাওয়ার আগেও এবং পরেও সবার কাছে “আল-আমীন” (আমানাতদার বা পরম বিশ্বস্ত) উপাধিতে পরিচিত ছিলেন। এছাড়া আল্লাহ তাআলা জান্নাতুল ফেরদাউসের অধিকারীদের অন্যতম গুণ হিসেবে এটি উল্লেখ করেছেন। সফল মুমিনদের বর্ণনা দিতে গিয়ে আল্লাহ তাআলা বলেন:

 ﴿وَالَّذِينَ هُمْ لِأَمَانَاتِهِمْ وَعَهْدِهِمْ رَاعُونَ﴾

অর্থ : এবং যারা তাদের আমানত ও প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে[সূরা আল-মুমিনুন: ৮]।

) পূর্ণাঙ্গ ঈমানের আলামত :

কোনো মানুষের ইসলাম বা ঈমান ততক্ষণ পর্যন্ত পূর্ণতা পায় না, যতক্ষণ না সে এমন আমানাতদার বা বিশ্বস্ত হয় যে মানুষ তাকে চোখ বন্ধ করে ভরসা করতে পারে। রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন-

لا إِيمَانَ لِمَن لا أَمَانَةَ لَهُ، وَلا دِينَ لِمَن لا عَهْدَ لَهُ

অর্থ : যার মধ্যে আমানতদারী (বিশ্বাসযোগ্যতা) নেই তার কোনো ঈমান নেই, আর যে প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে না তার কোনো দ্বীন (ধর্ম) নেই (সহীহ জামি-৭১৭৯)।”

) জান্নাত লাভ এবং কিয়ামতের দিন জাহান্নাম থেকে মুক্তির মাধ্যম :

যে ব্যক্তি নিজের আমানতকে সযত্নে রক্ষা করেছে, সে জীবনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষায় সফল হয়েছে। কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা তার জন্য ‘সিরাত’ (পুলসিরাত) পার হওয়া সহজ করে দেবেন। নবী করীম (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) জানিয়েছেন যে,

وَتُرْسَلُ الْأَمَانَةُ وَالرَّحِمُ، فَتَقُومَانِ جَنَبَتَيِ الصِّرَاطِ يَمِينًا وَشِمَالًا

কিয়ামতের দিন ‘আমানত’ এবং ‘আত্মীয়তার বন্ধন’ পুলসিরাতের দুই পাশে দাঁড়িয়ে থাকবে )যারা এগুলো রক্ষা করেছে তাদের হেফাযত করার জন্য এবং যারা খিয়ানত করেছে তাদের হিসাব নেওয়ার জন্য)। রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আরও বলেছেন-

أربعٌ إذا كنَّ فيك فلا يضرَّنَّك ما فاتك مِن الدُّنْيا: صِدْق حديث، وحِفْظ أمانة، وحُسْن خليقة، وعفَّة طُعْمة

চারটি গুণ যদি তোমার মধ্যে থাকে, তবে দুনিয়ার অন্য সব কিছু হারালেও তোমার কোনো ক্ষতি নেই : সত্য কথা বলা, আমানত রক্ষা করা, সুন্দর চরিত্র এবং হালাল উপার্জন (সহীহা-৭৩৩)।”

) রিজিকে বরকত এবং সমাজে শান্তি আনা : একজন বিশ্বস্ত মানুষকে সবাই তার ব্যবসা ও কাজে ভরসা করে। এর ফলে তার জন্য হালাল উপার্জনের পথ খুলে যায় এবং সমাজে শান্তি ও নিরাপত্তা ছড়িয়ে পড়ে।  নবী করীম (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন:

أَدِّ الْأَمَانَةَ إِلَى مَنِ ائْتَمَنَكَ، وَلَا تَخُنْ مَنْ خَانَكَ»

যে তোমাকে বিশ্বাস করেছে তার আমানত ফিরিয়ে দাও, আর যে তোমার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে তুমি তার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করো না (আবূ দাউদ৩৫৩৪ সহীহ)

  • আমানাতের খিয়ানাতের ভয়াবহতা  :
  • কুরআনের আলোকে আমানতের খিয়ানতের পরিণতি :

) খিয়ানতকারী আল্লাহর মুহাব্বাত থেকে বঞ্চিত হয় : মহান আল্লাহ পরিষ্কার করে দিয়েছেন যে, খিয়ানত করা কেবল কোনো সাধারণ পাপ বা গুনাহ নয়। বরং এটি এমন এক নিকৃষ্ট স্বভাব যা অবহেলা করলে মানুষকে মুনাফিকি কিংবা কুফরির দিকে নিয়ে যেতে পারে। মহান আল্লাহ বলেন

إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ مَنْ كَانَ خَوَّانًا أَثِيمًا

নিশ্চয়ই আল্লাহ কোনো বিশ্বাসভঙ্গকারী (খিয়ানতকারী) পাপীকে পছন্দ করেন না।” [সূরা আন-নিসা: ১০৭]। এখানে খাওয়ান‘ (خوَّان) শব্দটি দিয়ে এমন ব্যক্তিকে বোঝানো হয়েছে যে বারবার এবং অতিরিক্ত খিয়ানত করে।

) খিয়ানতকারীর চক্রান্তকে আল্লাহ সফল হতে দেন না : মহান আল্লাহ বলেন

وَأَنَّ اللَّهَ لَا يَهْدِي كَيْدَ الْخَائِنِينَ

  আর আল্লাহ খিয়ানতকারীদের চক্রান্ত সফল হতে দেন না।” [সূরা ইউসুফ: ৫২]।

) ক্বিয়ামতের দিন অপমান ও লাঞ্ছনা : প্রত্যেক খিয়ানতকারী ব্যক্তি ক্বিয়ামতের দিন সমস্ত সৃষ্টির সামনে তার খিয়ানত করা বস্তুটি পিঠে বহন করে হাজির হবে, যা সবার সামনে তার অপরাধকে ফাঁস করে দেবে :  মহান আল্লাহ বলেন-

وَمَنْ يَغْلُلْ يَأْتِ بِمَا غَلَّ يَوْمَ الْقِيَامَةِ

আর যে ব্যক্তি খিয়ানত করবে, সে ক্বিয়ামতের দিন সেই খিয়ানত করা বস্তু নিয়েই উপস্থিত হবে।” [সূরা আলে ইমরান: ১৬১]। (এখানে ‘গুলুল’ শব্দের অর্থ হলো খিয়ানত করা বা গোপনে কোনো কিছু আত্মসাৎ করা)।

৪) আল্লাহ তাআলা খিয়ানাত করতে নিষেধ করেছেন। তিনি বলেন-

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَخُونُوا اللَّهَ وَالرَّسُولَ وَتَخُونُوا أَمَانَاتِكُمْ وَأَنْتُمْ تَعْلَمُونَ (27)

হে মুমিনগণ! তোমরা জেনেশুনে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সাথে খেয়ানত করো না এবং তোমাদের পারস্পরিক আমানতসমূহেরও খেয়ানত করো না। সূরা আল-আনফাল  : ২৭

  • হাদীসের আলোকে আমানত খিয়ানতের পরিণতি :

১) খাঁটি মুনাফিকের স্বভাব : রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আমানতের খিয়ানত করাকে একজন প্রকৃত মুমিন ও মুনাফিকের মধ্যে পার্থক্যকারী স্পষ্ট লক্ষণ হিসেবে নির্ধারণ করেছেন। রাসূলুল্লাহ ﷺবলেছেন-

آيَةُ المُنَافِقِ ثَلاَثٌ: إِذَا حَدَّثَ كَذَبَ، وَإِذَا وَعَدَ أَخْلَفَ، وَإِذَا اؤْتُمِنَ خَانَ

 মুনাফিকের লক্ষণ তিনটি  : যখন কথা বলে মিথ্যা বলে, যখন ওয়াদা করে তা ভঙ্গ করে এবং যখন তার কাছে কোনো আমানত রাখা হয় সে তার খিয়ানত করে (বুখারী-৩৩)।”

অন্য একটি হাদিসে এসেছে

أَرْبَعٌ مَنْ كُنَّ فِيهِ كَانَ مُنَافِقًا خَالِصًا، وَمَنْ كَانَتْ فِيهِ خَصْلَةٌ مِنْهُنَّ كَانَتْ فِيهِ خَصْلَةٌ مِنَ النِّفَاقِ حَتَّى يَدَعَهَا: إِذَا اؤْتُمِنَ خَانَ، وَإِذَا حَدَّثَ كَذَبَ، وَإِذَا عَاهَدَ غَدَرَ، وَإِذَا خَاصَمَ فَجَرَ

চারটি স্বভাব যার মধ্যে থাকে সে হবে খাঁটি মুনাফিক। যার মধ্যে এর কোন একটি স্বভাব থাকবে, তা পরিত্যাগ না করা পর্যন্ত তার মধ্যে মুনাফিকের একটি স্বভাব থেকে যায়। ১. আমানত রাখা হলে খেয়ানত করে২. কথা বললে মিথ্যা বলে৩. চুক্তি করলে ভঙ্গ করে এবং ৪. বিবাদে লিপ্ত হলে অশ্লীল গালি দেয়  (বুখারী-৩৪)।

২) দুনিয়াতেই দ্রুত শাস্তি দেওয়া হবে : খিয়ানত এমন একটি পাপ, যার পুরো শাস্তি আল্লাহ তাআলা পরকালের জন্য বাকি রাখেন না; বরং এর অশুভ পরিণতি দুনিয়াতেই মানুষকে ভোগ করান। তিনি ﷺ বলেছেন-

ما من ذنبٍ أجدرُ أن يُعجِّلَ اللهُ تعالى لصاحبِه العقوبةَ في الدنيا ، مع ما يَدِّخِرُه له في الآخرةِ من قطيعةِ الرَّحِمِ ، والخيانةِ ، والكذبِ ، وإنَّ أَعجلَ الطاعةِ ثوابًا لصلَةُ الرَّحِمِ ، حتى إنَّ أهلَ البيتِ ليكونوا فجَرةً ، فتنمو أموالُهم ، ويكثُرُ عددُهم ، إذا تواصَلوا

আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা, খিয়ানত এবং মিথ্যা—এই পাপগুলোর জন্য পরকালের নির্ধারিত শাস্তির পাশাপাশি ইহকালেই আল্লাহ তাআলা দ্রুত শাস্তি প্রদানের সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন। পক্ষান্তরে, যে আনুগত্যের প্রতিদান সবচেয়ে দ্রুত পাওয়া যায়, তা হলো আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা। বস্তুত, কোনো পরিবার যদি আত্মীয়তার বন্ধন অটুট রাখে, তবে তারা পাপাচারী হওয়া সত্ত্বেও তাদের সম্পদ বৃদ্ধি পায় এবং তাদের বংশের লোক সংখ্যাও বেড়ে যায় (সহীহুল জামি-৫৭০৫)।

  • আমানাত রক্ষা করার দৃষ্টান্ত :

দৃষ্টান্ত : ১

قَالَ أَبُو عَبْدِ اللَّهِ وَقَالَ اللَّيْثُ حَدَّثَنِي جَعْفَرُ بْنُ رَبِيعَةَ، عَنْ عَبْدِ الرَّحْمَنِ بْنِ هُرْمُزَ، عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ ـ رضى الله عنه ـ عَنْ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ‏ “‏ أَنَّهُ ذَكَرَ رَجُلاً مِنْ بَنِي إِسْرَائِيلَ سَأَلَ بَعْضَ بَنِي إِسْرَائِيلَ أَنْ يُسْلِفَهُ أَلْفَ دِينَارٍ، فَقَالَ ائْتِنِي بِالشُّهَدَاءِ أُشْهِدُهُمْ‏.‏ فَقَالَ كَفَى بِاللَّهِ شَهِيدًا‏.‏ قَالَ فَأْتِنِي بِالْكَفِيلِ‏.‏ قَالَ كَفَى بِاللَّهِ كَفِيلاً‏.‏ قَالَ صَدَقْتَ‏.‏ فَدَفَعَهَا إِلَيْهِ إِلَى أَجَلٍ مُسَمًّى، فَخَرَجَ فِي الْبَحْرِ، فَقَضَى حَاجَتَهُ، ثُمَّ الْتَمَسَ مَرْكَبًا يَرْكَبُهَا، يَقْدَمُ عَلَيْهِ لِلأَجَلِ الَّذِي أَجَّلَهُ، فَلَمْ يَجِدْ مَرْكَبًا، فَأَخَذَ خَشَبَةً، فَنَقَرَهَا فَأَدْخَلَ فِيهَا أَلْفَ دِينَارٍ، وَصَحِيفَةً مِنْهُ إِلَى صَاحِبِهِ، ثُمَّ زَجَّجَ مَوْضِعَهَا، ثُمَّ أَتَى بِهَا إِلَى الْبَحْرِ، فَقَالَ اللَّهُمَّ إِنَّكَ تَعْلَمُ أَنِّي كُنْتُ تَسَلَّفْتُ فُلاَنًا أَلْفَ دِينَارٍ، فَسَأَلَنِي كَفِيلاً، فَقُلْتُ كَفَى بِاللَّهِ كَفِيلاً، فَرَضِيَ بِكَ، وَسَأَلَنِي شَهِيدًا، فَقُلْتُ كَفَى بِاللَّهِ شَهِيدًا، فَرَضِيَ بِكَ، وَأَنِّي جَهَدْتُ أَنْ أَجِدَ مَرْكَبًا، أَبْعَثُ إِلَيْهِ الَّذِي لَهُ فَلَمْ أَقْدِرْ، وَإِنِّي أَسْتَوْدِعُكَهَا‏.‏ فَرَمَى بِهَا فِي الْبَحْرِ حَتَّى وَلَجَتْ فِيهِ، ثُمَّ انْصَرَفَ، وَهْوَ فِي ذَلِكَ يَلْتَمِسُ مَرْكَبًا، يَخْرُجُ إِلَى بَلَدِهِ، فَخَرَجَ الرَّجُلُ الَّذِي كَانَ أَسْلَفَهُ، يَنْظُرُ لَعَلَّ مَرْكَبًا قَدْ جَاءَ بِمَالِهِ، فَإِذَا بِالْخَشَبَةِ الَّتِي فِيهَا الْمَالُ، فَأَخَذَهَا لأَهْلِهِ حَطَبًا، فَلَمَّا نَشَرَهَا وَجَدَ الْمَالَ وَالصَّحِيفَةَ، ثُمَّ قَدِمَ الَّذِي كَانَ أَسْلَفَهُ، فَأَتَى بِالأَلْفِ دِينَارٍ، فَقَالَ وَاللَّهِ مَا زِلْتُ جَاهِدًا

فِي طَلَبِ مَرْكَبٍ لآتِيَكَ بِمَالِكَ، فَمَا وَجَدْتُ مَرْكَبًا قَبْلَ الَّذِي أَتَيْتُ فِيهِ‏.‏ قَالَ هَلْ كُنْتَ بَعَثْتَ إِلَىَّ بِشَىْءٍ قَالَ أُخْبِرُكَ أَنِّي لَمْ أَجِدْ مَرْكَبًا قَبْلَ الَّذِي جِئْتُ فِيهِ‏.‏ قَالَ فَإِنَّ اللَّهَ قَدْ أَدَّى عَنْكَ الَّذِي بَعَثْتَ فِي الْخَشَبَةِ فَانْصَرِفْ بِالأَلْفِ الدِّينَارِ رَاشِدًا ‏”‏‏.‏

বর্ণনাকারী: লায়স (রহঃ) আবূ হুরায়রা (রাঃ) হতে আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, বনী ইসরাঈলের কোন এক ব্যক্তি বনী ইসরাঈলের অপর এক ব্যক্তির নিকট এক হাজার দীনার ঋণ চাইল। তখন সে (ঋণদাতা) বলল, কয়েকজন সাক্ষী আন, আমি তাদেরকে সাক্ষী রাখব। সে বলল, সাক্ষী হিসাবে আল্লাহই যথেষ্ট। তারপর (ঋণদাতা) বলল, তা হলে একজন যামিনদার উপস্থিত কর। সে বলল, যামিনদার হিসাবে আল্লাহই যথেষ্ট। ঋণদাতা বলল, তুমি সত্যই বলেছ। এরপর নির্ধারিত সময়ে তাকে এক হাজার দীনার দিয়ে দিল। তারপর ঋণ গ্রহীতা সামুদ্রিক সফর করল এবং তার প্রয়োজন সমাধা করে সে যানবাহন খুঁজতে লাগল, যাতে সে নির্ধারিত সময়ের ভেতর ঋণদাতার কাছে এসে পৌঁছতে পারে। কিন্তু সে কোন যানবাহন পেল না। তখন সে এক টুকরো কাঠ নিয়ে তা ছিদ্র করল এবং ঋণদাতার নামে একখানা পত্র ও এক হাজার দীনার তার মধ্যে ভরে ছিদ্রটি বন্ধ করে সমুদ্র তীরে এসে বলল, হে আল্লাহ! তুমি তো জান আমি অমুকের নিকট এক হাজার দীনার ঋণ চাইলে সে আমার কাছে যামিনদার চেয়েছিল। আমি বলেছিলাম, আল্লাহই যামিন হিসাবে যথেষ্ট। এতে সে রাজী হয়। তারপর সে আমার কাছে সাক্ষী চেয়েছিল, আমি বলেছিলাম সাক্ষী হিসাবে আল্লাহই যথেষ্ট, তাতে সে রাজী হয়ে যায়। আমি তার ঋণ (যথাসময়ে) পরিশোধের উদ্দেশ্যে যানবাহনের জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করেছি, কিন্তু পাইনি। তাই আমি তোমার নিকট সোপর্দ করলাম, এই বলে সে কাষ্ঠখন্ডটি সমুদ্রে নিক্ষেপ করল। আর কাষ্ঠখন্ডটি সমুদ্রে প্রবেশ করল। অতঃপর লোকটি ফিরে গেল এবং নিজের শহরে যাওয়ার জন্য যানবাহন খুঁজতে লাগল। ওদিকে ঋণদাতা এই আশায় সমুদ্রতীরে গেল যে, হয়ত বা ঋণগ্রহীতা কোন নৌযানে করে তার মাল নিয়ে এসেছে। তার দৃষ্টি কাষ্ঠখন্ডটির উপর পড়ল, যার ভিতরে মাল ছিল। সে কাষ্ঠখন্ডটি তার পরিবারের জ্বালানীর জন্য বাড়ী নিয়ে গেল। যখন সে তা চিরল, তখন সে মাল ও পত্রটি পেয়ে গেল। কিছুদিন পর ঋণগ্রহীতা এক হাজার দীনার নিয়ে এসে হাযির হল এবং বলল, আল্লাহর কসম! আমি আপনার মাল যথাসময়ে পৌঁছিয়ে দেয়ার উদ্দেশ্যে সব সময় যানবাহনের খোঁজে ছিলাম। কিন্তু আমি যে নৌযানে এখন আসলাম, তার আগে আর কোন নৌযান পাইনি। ঋণদাতা বলল, তুমি কি আমার নিকট কিছু পাঠিয়েছিলে? ঋণগ্রহীতা বলল, আমি তো তোমাকে বললামই যে, এর আগে আর কোন নৌযান আমি পাইনি। সে বলল, তুমি কাঠের টুকরোর ভিতরে যা পাঠিয়েছিলে, তা আল্লাহ তোমার পক্ষ হতে আমাকে আদায় করে দিয়েছেন। তখন সে আনন্দচিত্তে এক হাজার দীনার নিয়ে ফিরে চলে গেল। সহীহ বুখারী-২২৯১।

 দৃষ্টান্ত : ২

حَدَّثَنَ إِسْحَاقُ بْنُ نَصْرٍ، أَخْبَرَنَا عَبْدُ الرَّزَّاقِ، عَنْ مَعْمَرٍ، عَنْ هَمَّامٍ، عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ ـ رضى الله عنه ـ قَالَ قَالَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم ‏ “‏ اشْتَرَى رَجُلٌ مِنْ رَجُلٍ عَقَارًا لَهُ، فَوَجَدَ الرَّجُلُ الَّذِي اشْتَرَى الْعَقَارَ فِي عَقَارِهِ جَرَّةً فِيهَا ذَهَبٌ، فَقَالَ لَهُ الَّذِي اشْتَرَى الْعَقَارَ خُذْ ذَهَبَكَ مِنِّي، إِنَّمَا اشْتَرَيْتُ مِنْكَ الأَرْضَ، وَلَمْ أَبْتَعْ مِنْكَ الذَّهَبَ‏.‏ وَقَالَ الَّذِي لَهُ الأَرْضُ إِنَّمَا بِعْتُكَ الأَرْضَ وَمَا فِيهَا، فَتَحَاكَمَا إِلَى رَجُلٍ، فَقَالَ الَّذِي تَحَاكَمَا إِلَيْهِ أَلَكُمَا وَلَدٌ قَالَ أَحَدُهُمَا لِي غُلاَمٌ‏.‏ وَقَالَ الآخَرُ لِي جَارِيَةٌ‏.‏ قَالَ أَنْكِحُوا الْغُلاَمَ الْجَارِيَةَ، وَأَنْفِقُوا عَلَى أَنْفُسِهِمَا مِنْهُ، وَتَصَدَّقَا ‏”‏‏.‏

আবূ হুরায়রা (রাঃ)তিনি বলেন, আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, এক লোক অপর লোক হতে একখন্ড জমি ক্রয় করেছিল। ক্রেতা খরিদকৃত জমিতে একটা স্বর্ণ ভর্তি ঘড়া পেল। ক্রেতা বিক্রেতাকে তা ফেরত নিতে অনুরোধ করে বলল, কারণ আমি জমি ক্রয় করেছি, স্বর্ণ ক্রয় করিনি। বিক্রেতা বলল, আমি জমি এবং এতে যা কিছু আছে সবই বেচে দিয়েছি। অতঃপর তারা উভয়েই অপর এক লোকের কাছে এর মীমাংসা চাইল। তিনি বললেন, তোমাদের কি ছেলে-মেয়ে আছে? একজন বলল, আমার একটি ছেলে আছে। অন্য লোকটি বলল, আমার একটি মেয়ে আছে। মীমাংসাকারী বললেন, তোমার মেয়েকে তার ছেলের সঙ্গে বিবাহ দাও আর প্রাপ্ত স্বর্ণের মধ্যে কিছু তাদের বিবাহে ব্যয় কর এবং বাকী অংশ তাদেরকে দিয়ে দাও (সহীহ বুখারী-৩৪৭২)।

সুতরাং লক্ষ্য করুন-কীভাবে তারা দুজন সোনার একটি কলসি নিয়ে পরস্পরকে দেওয়ার জন্য অনুনয়-বিনয় করছে। তাদের প্রত্যেকেই সেটি নিজে নিতে অস্বীকার করছে এবং অন্যজনকে দেওয়ার জন্য ঠেলছে। কোন জিনিসটি তাদের এই কাজে বাধ্য করল? তা হলো মহান আল্লাহ তাআলার ভয়। আমানতের খেয়ানত (বিশ্বাসভঙ্গ) করার ভয়, হারাম ভক্ষণ করার ভয় তাদের বিরত রাখছে।

সম্মানিত শ্রোতামণ্ডলী!  মনে রাখতে হবে যে, যারা মানুষের অধিকার নষ্ট করে এবং অন্যায়ভাবে তা গ্রাস করে, তাদেরকে অবশ্যই একদিন তাদের এই অধিকারগুলো ফিরিয়ে দিতেই হবে? এমন একদিন, যেদিন কারও ওপর সামান্যতম জুলুম করা হবে না। যেদিন সমস্ত অধিকার তার প্রকৃত মালিকের কাছে পৌঁছে দেওয়া হবে। আল্লাহর রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন-

لَتُؤَدُّنَّ الْحُقُوقَ إِلَى أَهْلِهَا يَوْمَ الْقِيَامَةِ، حَتَّى يُقَادَ لِلشَّاةِ الْجَلْحَاءِ، مِنَ الشَّاةِ الْقَرْنَاءِ

কিয়ামতের দিন অবশ্যই হকদারদের পাওনা মিটিয়ে দেওয়া হবে। এমনকি শিংবিহীন ছাগলের প্রতিশোধ শিংওয়ালা ছাগল থেকে নেওয়া হবে  (সহীহ মুসলিম-২৫৮২)।”

  • আমানত রক্ষার ফযীলত ও খিয়ানত করার ভয়াবহতার একটি তালিকা দেওয়া হল
১) আমানতদার সমাজ (যে সমাজ আমানত রক্ষা করে) ২) মানুষের মধ্যে পারস্পরিক বিশ্বাস ও শান্তি ছড়িয়ে পড়ে। ৩) সম্পদে বরকত আসে এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের উন্নতি হয়।   ৪) সবার অধিকার, দায়িত্ব এবং গোপন তথ্য সুরক্ষিত থাকে।১) খিয়ানতকারী সমাজ (যে সমাজ আমানত নষ্ট করে) ২) ভয়ভীতি, সন্দেহ এবং দ্বন্দ্ব-সংঘাত তৈরি হয়। ৩) সংসারের বরকত চলে যায়, সমাজে দারিদ্রতা ও প্রতারণা সৃষ্টি হয়। ৪) অধিকার নষ্ট হয়, গোপন তথ্য ফাঁস হয় এবং সম্পদ লুটপাট হয়।

দুআ : আমাদের উচিত সর্বাবস্থায় আমানাতের হিফাযাত করা এবং কোনো অবস্থাতেই খিয়ানাত না করা। হে আল্লাহ! তুমি আমাদেরকে আমানাতের হিফাযাত করার এবং খিয়ানাত থেকে বিরত থাকার তাওফীক দাও, আমীন।

Leave a Reply