মানবতার সংরক্ষণে ওহীর গুরুত্ব

হাদীসের নামে জালিয়াতি ১. ওহী ও হাদীস ড. খোন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর (রহ.)

মহান আল্লাহ তাঁর প্রিয় সৃষ্টি মানব জাতিকে অত্যন্ত ভালবাসেন। মানুষকে তিনি সৃষ্টির সেরা হিসাবে তৈরি করেছেন। তাকে দান করেছেন জ্ঞান, বিবেক ও যুক্তি যা তাকে উত্তরোত্তর সমৃদ্ধি ও কল্যাণের পথে পরিচালিত করে।

মানুষের এ জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা আছে। মানুষ তার জ্ঞান, বিবেক ও বিবেচনা দিয়ে তার পার্থিব জগতের বিভিন্ন বিষয়ে অনেক কিছু জানতে পারে এবং নিজেকে উন্নতি ও সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিতে পারে, কিন্তু তার ইন্দ্রিয়ের বাইরের কিছু সে জানতে পারে না।

এজন্য ইন্দ্রিয়ের অতীত কোন বিষয়ে মানুষ জ্ঞান, বিবেক বা যুক্তি দিয়ে সঠিক সমাধানে পৌঁছাতে অনুরূপভাবে সক্ষম হয় না। আমরা ইতিহাসের দিকে তাকালেই তা বুঝতে পারি।

অভিজ্ঞতা ও গবেষণার

জাগতিক বিষয়গুলো মানুষ অভিজ্ঞতা ও গবেষণার মাধ্যমে জানতে পারে। কিভাবে চাষ করলে বেশি ফল ফসল হবে, কিভাবে বাড়ি বানালে বেশি টেকসই হবে, কিভাবে গাড়ি বানালে দ্রুত চলবে, কিভাবে রান্না করলে খাদ্যমানের বেশি সাশ্রয় হবে, কিভাবে ব্যবসা করলে লাভ বেশি হবে বা পুঁজির নিরাপত্তা বাড়বে, কিভাবে চিকিৎসা করলে আরোগ্যের সম্ভাবনা, নিশ্চয়তা বা হার বাড়বে ইত্যাদি বিষয় মানবীয় অভিজ্ঞতা, গবেষণা, যুক্তি ও চিন্তার মাধ্যমে জানা যায়।

ঐন্দ্রিক জ্ঞান

কিন্তু ধর্মীয় বিশ্বাস, কর্ম ও আচার আচরণ বিষয়ক জ্ঞান কখনো অভিজ্ঞতা বা ঐন্দ্রিক জ্ঞানের মাধ্যমে জানা যায় না।

  • আল্লাহর সম্পর্কে বিশ্বাস কিরূপ হতে হবে,
  • কিভাবে নবী-রাসূলগণের উপর বিশ্বাস রাখতে হবে,
  • পরকালের সঠিক বিশ্বাস কী,
  • কিভাবে আল্লাহকে ডাকতে হবে,
  • কোন্ কর্ম করলে তাঁর রহমত ও বরকত বেশি পাওয়া যাবে,
  • কিভাবে চললে আখেরাতে মুক্তির সম্ভাবনা বাড়বে,
  • কোন্ পদ্ধতিতে চললে দ্রুত আল্লাহর বন্ধুত্ব অর্জন করা যাবে,
  • কোন্ কাজ করলে বেশি সাওয়াব অর্জন করা যাবে,
  • কোন্ কর্মে পাপের ক্ষমালাভ হয় ইত্যাদি অধিকাংশ ধর্মীয় ও বিশ্বাসীয় বিষয় কখনোই অভিজ্ঞতা বা গবেষণার মাধ্যমে চূড়ান্তরূপে জানা যায় না বা এ বিষয়ক কোনো সমস্যা গবেষণা বা অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞানের মাধ্যমে চূড়ান্ত সমাধান করা যায় না।

নবী রাসূল প্রেরণ

এ জন্য আল্লাহ মানুষকে জ্ঞান-বুদ্ধি ও বিবেক দিয়ে সৃষ্টির সেরা রূপে সৃষ্টি করার পরেও তার পথ প্রদর্শনের জন্য যুগে যুগে নবী-রাসূল প্রেরণ করেছেন।

তিনি যুগে যুগে বিভিন্ন জাতি ও জনগোষ্ঠির মধ্য থেকে কিছু মহান মানুষকে বেছে নিয়ে তাদের কাছে তাঁর বাণী, ওহী বা প্রত্যাদেশ (revelation) প্রেরণ করেছেন।

মানুষ যুক্তি, বুদ্ধি, বিবেক, গবেষণা ও অভিজ্ঞতা দিয়ে যে সকল বিষয় জানতে পারে না বা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারে না সে সকল বিষয় ওহীর মাধ্যমে শিক্ষা দান করেছেন।

এ ছাড়া মানুষ বুদ্ধি ও বিবেক দিয়ে যে সকল বিষয় ভাল বা মন্দ বলে বুঝতে পারে সে সকল বিষয়েও ভাল-মন্দের পর্যায়, গুরুত্ব, পালনের উপায় ইত্যাদি তিনি ওহীর মাধ্যমে জানিয়েছেন।

সংরক্ষণ

ওহীর মাধ্যমে প্রাপ্ত জ্ঞানের সংরক্ষণ ও তার অনুসরণ ব্যতীত মানব জাতি ও মানব সভ্যতার সংরক্ষণ সম্ভব নয়। স্বার্থের সংঘাত, হানাহানি ও স্বার্থপরতা দূর করে প্রকৃত ভালবাসা, সেবা ও মানবীয় মূল্যবোধগুলির বিকাশ করতে ওহীর জ্ঞানের উপরেই নির্ভর করতে হবে।

বিশ্বাস, সততা, পাপ, পূণ্য, স্রষ্টা, পরকাল ইত্যাদি বিষয়ে ওহীর বাইরে মানবীয় বিবেক, অভিজ্ঞতা বা গবেষণার আলোকে যা কিছু বলা হয় সবই বিতর্ক, সংঘাত ও বিভক্তি বৃদ্ধি করে।

কারণ এ সকল ক্ষেত্রে চূড়ান্ত সত্য কখনোই ওহী ছাড়া মানবীয় প্রচেষ্টার মাধ্যমে জানা যায় না। মানব সভ্যতার ইতিহাস পর্যালোচনা করলে আমরা দেখতে পাই যে, ওহীর মাধ্যমে প্রাপ্ত জ্ঞানের বিকৃতি বা বিলুপ্তির কারণেই বিভিন্ন জাতি বিভ্রান্ত হয়েছে।

তথ্যসূত্র

বইঃ হাদীসের নামে জালিয়াতি

অধ্যায়; ওহী ও হাদীস

লেখকঃ ড. খোন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর (রহ.)

সোশ্যাল মিডিয়া

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *