শৌচালয়ের আদব ও পবিত্রতা অর্জনের সঠিক সুন্নাহ নিয়ম | লেখক : তাজাম্মুল হক সালাফী
إِنَّ الْحَمْدَ لِلَّهِ، وَالصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ عَلَى رَسُولِ اللَّهِ فاعوذ بالله من الشيطان الرجيم بِسۡمِ ٱللَّهِ ٱلرَّحۡمَٰنِ ٱلرَّحِيمِ-فِيهِ رِجَالٌ يُحِبُّونَ أَنْ يَتَطَهَّرُوا وَاللَّهُ يُحِبُّ الْمُطَّهِّرِينَ (108)
পবিত্রতা ও পরিচ্ছন্নতা ঈমানের অঙ্গ। আল্লাহ তাআলা পবিত্রতা অর্জনকারীদের ভালোবাসেন। তিনি মদীনার কুবা অঞ্চলের মুসলমানদের উত্তমরূপে শৌচকার্য সম্পাদনের প্রশংসা করে বলেন-
فِيهِ رِجَالٌ يُحِبُّونَ أَنْ يَتَطَهَّرُوا وَاللَّهُ يُحِبُّ الْمُطَّهِّرِينَ (108)
“সেখানে এমন লোক রয়েছে, যারা উত্তমরূপে পবিত্রতা অর্জন করতে ভালোবাসে। আর আল্লাহ পবিত্রতা অর্জনকারীদের ভালোবাসেন।” (সূরা আত-তাওবাহ, আয়াত: ১০৮)। সাহাবীগণ পাথর বা ঢিলা ব্যবহারের পাশাপাশি পানি দিয়ে উত্তমরূপে শৌচকার্য করতেন বলে এই আয়াত নাযিল হয়েছিল।
দৈনন্দিন জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ শৌচকর্ম বা ইস্তিঞ্জা (পেশাব-পায়খানা)। সুতরাং শৌচালয়ের নিয়ম কানুন ও আদব সম্পর্কে জানার প্রত্যেকের জন্য অপরিহার্য।
১) পবিত্র কুরআনের আলোক শৌচালয়ের আদব ও পবিত্রতা অর্জনের সঠিক সুন্নাহ নিয়ম
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ পবিত্রতা অর্জনকারীদের প্রশংসা করেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন-إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ التَّوَّابِينَ وَيُحِبُّ الْمُتَطَهِّرِينَ (222) “নিশ্চয়ই আল্লাহ তওবাকারীদের ভালোবাসেন এবং যারা পবিত্র থাকে তাদেরও ভালোবাসেন।” (সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত: ২২২)।
২) শৌচাগারে প্রবেশের পূর্বের আদব :
বাথরুমে প্রবেশের ঠিক পূর্বে এই দুআটি পড়া সুন্নাত-بِسْمِ اللهِ، اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الْخُبْثِ وَالْخَبَائِثِ উচ্চারণ : বিসমিল্লাহি আল্লাহুম্মা ইন্নি আউযুবিকা মিনাল খুবুসি ওয়াল খাবাইস। অর্থ : আল্লাহর নামে শুরু করছি। হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে পুরুষ ও নারী শয়তানের অনিষ্ট থেকে আশ্রয় চাচ্ছি (বুখারী-১৪২)।
বাম পা দিয়ে প্রবেশ : দুআ পড়ার পর প্রথমে বাম পা দিয়ে শৌচাগারে প্রবেশ করতে হয়।
৩) শৌচাগারের ভেতরের আদব (সহীহ হাদীসের আলোকে)
কিবলামুখী বা কিবলাকে পেছনে রেখে না বসা : শৌচকর্মের সময় কাবার দিকে মুখ করে বা পিঠ করে বসা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। সহীহ বুখারীর হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন-«إِذَا أَتَى أَحَدُكُمُ الغَائِطَ، فَلاَ يَسْتَقْبِلِ القِبْلَةَ وَلاَ يُوَلِّهَا ظَهْرَهُ، شَرِّقُوا أَوْ غَرِّبُوا» যখন তোমরা মলমূত্র ত্যাগের জন্য যাবে, তখন কেবলাকে সামনে বা পেছনে রাখবে না।…” (সহীহ বুখারী, হাদীস: ১৪৪)।
বাম হাতের ব্যবহার :
শৌচকার্য বা লজ্জাস্থান পরিষ্কার করার জন্য সর্বদা বাম হাত ব্যবহার করতে হবে। ডান হাত দিয়ে লজ্জাস্থান স্পর্শ করা বা পরিষ্কার করা নিষেধ। সহীহ মুসলিমে এসেছে-«لَقَدْ نَهَانَا أَنْ نَسْتَقْبِلَ الْقِبْلَةَ لِغَائِطٍ، أَوْ بَوْلٍ، أَوْ أَنْ نَسْتَنْجِيَ بِالْيَمِينِ، أَوْ أَنْ نَسْتَنْجِيَ بِأَقَلَّ مِنْ ثَلَاثَةِ أَحْجَارٍ، أَوْ أَنْ نَسْتَنْجِيَ بِرَجِيعٍ أَوْ بِعَظْمٍ» সালমান ফারসী রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন : নিশ্চয়ই তিনি (রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আমাদেরকে পায়খানা বা প্রস্রাবের সময় কিবলামুখী হতে, ডান হাত দিয়ে ইস্তিঞ্জা (শৌচকার্য) করতে, তিনটির কম পাথর দিয়ে ইস্তিঞ্জা করতে, অথবা গোবর বা হাড় দিয়ে ইস্তিঞ্জা করতে নিষেধ করেছেন (সহীহ মুসলিম, হাদীস-২৬২)
কথা বলা ও যিকর থেকে বিরত থাকা :
শৌচাগারে থাকা অবস্থায় কথা বলা, মুখে আল্লাহর নাম নেওয়া, যিকর করা বা সালামের জবাব দেওয়াও নিষেধ।عَنِ ابْنِ عُمَرَ: «أَنَّ رَجُلًا مَرَّ وَرَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَبُولُ، فَسَلَّمَ، فَلَمْ يَرُدَّ عَلَيْهِ» ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণিত :
এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন, যখন তিনি প্রস্রাব করছিলেন। অতঃপর ওই ব্যক্তি তাঁকে সালাম দিলে তিনি তাঁর সালামের উত্তর দেননি।” (সহীহ মুসলিম-৩৭০) ।
সালামের জবাব দেওয়া ওয়াজিব বা আবশ্যক হওয়া সত্ত্বেও শৌচাগারে থাকার কারণে তিনি তা বর্জন করেছেন। এ থেকে প্রমাণিত হয় যে, সাধারণ কথাবার্তা সেখানে আরও বেশি বর্জনীয়
ছিটেফোঁটা থেকে সতর্ক থাকা :
পেশাবের ছিটেফোঁটা থেকে শরীর ও কাপড় অত্যন্ত সতর্কতার সাথে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, «أَكْثَرُ عَذَابِ الْقَبْرِ مِنَ الْبَوْلِ» কবরের অধিকাংশ আযাব পেশাবের পবিত্রতা ঠিকমতো না রাখার কারণেই হয়ে থাকে (ইবনু মাজাহ-৩৮৪)।
৪) শৌচাগার থেকে বের হওয়ার আদব :
বের হওয়ার পর এই সংক্ষিপ্ত দুআটি পড়তে হয়:غُفْرَانَكَ (গুফরা-নাকা) অর্থ : (হে আল্লাহ!) আমি আপনার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি (ইবনু মাজাহ-৩০০, সহীহ)।
৫) নিষিদ্ধ স্থানসমূহ :
জনসাধারণের চলাচল বা বিশ্রামের জায়গায় শৌচকর্ম করা ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
«اتَّقُوا اللَّعَّانَيْنِ» قَالُوا: وَمَا اللَّعَّانَانِ يَا رَسُولَ اللهِ؟ قَالَ: «الَّذِي يَتَخَلَّى فِي طَرِيقِ النَّاسِ، أَوْ فِي ظِلِّهِمْ»
“তোমরা লানত বা অভিশাপের দুটি কাজ থেকে বেঁচে থাকো। সাহাবীগণ বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! অভিশাপের কাজ দুটি কী? তিনি বললেন : মানুষের যাতায়াতের রাস্তায় কিংবা তাদের বিশ্রামের ছায়াদার জায়গায় মলমূত্র ত্যাগ করা।” (সহীহ মুসলিম-২৬৯)
বি : দ্রঃ শৌচাগারে প্রবেশের সময় বাম পা আগে বাড়ানো এবং বের হওয়ার সময় ডান পা আগে বাড়ানো মুস্তাহাব (উত্তম)। এটি চার মাযহাব—হানাফী, মালেকী, শাফেয়ী ও হাম্বলী—এর সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত (ঐকমত্য)।
ইমাম নববী (রহ.) এই বিষয়ে সবার ঐকমত্যের কথা উল্লেখ করেছেন (আলমাজুমূ-২/৭৭)। এর কারণ হলো, শরীয়তের এই নিয়মটি সুপ্রতিষ্ঠিত যে—যেসব কাজে ডান ও বাম উভয় দিক জড়িত থাকে, সেগুলোর মধ্যে সম্মান বা মর্যাদাপূর্ণ কাজের ক্ষেত্রে ডান দিককে আগে রাখা হয় (যেমন: ওযু, গোসল ইত্যাদি)। আর এর বিপরীত কাজের ক্ষেত্রে (যেমন: শৌচাগারে প্রবেশ) বাম দিককে আগে রাখা হয় (আলমাজমূ-১/৩৮৪)।”
পরিশেষে বলতে চাই যে, ইসলামে শৌচালয়ের আদব বা পবিত্রতা অর্জনের বিধান কেবল বাহ্যিক পরিচ্ছন্নতা নয়, বরং এটি আত্মিক পরিশুদ্ধি ও ঈমানের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
শৌচাগারে প্রবেশের পূর্ব মুহূর্ত থেকে শুরু করে বের হওয়া পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর নির্দেশিত সুন্নাহ ও আদব মেনে চললে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও পরকালীন সওয়াব অর্জন সম্ভব হয়।
পরিশেষে বলা যায়, দৈনন্দিন জীবনের এই অতি সাধারণ অভ্যাসটিকেও সুন্নাহ মোতাবেক পরিচালনার মাধ্যমে ইবাদতে রূপান্তর করাই ইসলামের প্রকৃত সৌন্দর্য। হে আল্লাহ তুমি আমাদেরকে শৌচালয়ের আদব পালন করার তাওফীক দাও, আমীন। وَآخِرُ دَعْوَانَا أَنِ الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِين
শৌচালয়ের আদব ও পবিত্রতা অর্জনের সঠিক সুন্নাহ নিয়ম


