তাফসীর সূরা ফাতিহা

  1. সূরা ফাতিহা

আয়াত, মাক্বী

بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ (1) الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ (2) الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ (3) مَالِكِ يَوْمِ الدِّينِ (4) إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ (5) اهْدِنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقِيمَ (6) صِرَاطَ الَّذِينَ أَنْعَمْتَ عَلَيْهِمْ غَيْرِ الْمَغْضُوبِ عَلَيْهِمْ وَلَا الضَّالِّينَ (7)

 অনুবাদ :

(শুরু করছি) অসীম দয়াময় পরম করুণাময় আল্লাহর নামে।

) সমস্ত প্রশংসা জগতসমূহের রব আল্লাহর জন্য

) যিনি অসীম দয়াময়, পরম করুণাময়,

) প্রতিদান দিবসের  মালিক।

) আমরা কেবল তোমারই ইবাদত করি এবং তোমার নিকটেই সাহায্য চাই।

) তুমি আমাদেরকে স্বিরাতে মুস্তাক্বীমে পরিচালিত করো।

) তাদের পথে, যাদের প্রতি তুমি অনুগ্রহ করেছ,

) তাদের পথে, যারা ক্রোধভাজনও (ইহুদি) নয় এবং যারা পথভ্রষ্টও (খ্রীষ্টান) নয়।৫

তাফসীর :

) ফাতিহাপ্রারম্ভিক সূরা। এটিকে উম্মুল কুরআন, উম্মুল কিতাব, আসসাবউল মাসানী (অর্থাৎ সাতটি আয়াতবিশিষ্ট বারে বারে পঠিতব্য সূরা) ইত্যাদি নামে অভিহিত করা হয় (আবূ দাউদ, হাদীস নং১৪৫৭, স্বহীহআলবানী) একাকী হোক বা জামাআতের সঙ্গে হোক স্বলাতে সূরা ফাতিহা পড়া জরুরী, না পড়লে স্বলাত শুদ্ধ হবে না (আবূ দাঊদ, হাদীস নং৮২২, স্বহীহআলবানী, তিরমিযী, হাদীস নং২৪৭, স্বহীহআলবানী)

কোন সূরা বা আয়াত প্রথম অবতীর্ণ হয়েছিল বিষয়ে মতপার্থক্য রয়েছে। কেউ বলেছেন, সূরা ফাতিহা।  কেউ বলেছেন, ইয়া আইউহাল মুদ্দাস্সির-(সূরা মুদ্দাস্সির) আবার কেউ বলেছেন , সূরা আলাক্বের প্রথম পাঁচটি আয়াত। সূরা আলাক্বের প্রথম পাঁচটি আয়াত প্রথম অবতীর্ণ হয়েছিলএটিই সঠিক (ইবনু কাসীর) আল্লাহ তাআলাই সঠিক জানেন।

 এই সূরার আয়াত সংখ্যা ছয় না সাত ? বিসমিল্লাহকে আয়াত হিসাবে গণনা করলে আয়াত সংখ্যা হবে সাত আর গণনা না করলে আয়াত সংখ্যা হবে ছয়। সূরা হিজরের ৮৭ নং আয়াত এবং আল্লাহর রসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি সাল্লামের হাদীস : সূরা ফাতিহা হল সাবউল মাসানী (স্বহীহুল বুখারী, হাদীস নং৪৪৭৪, আবূ দাঊদ, হাদীস নং১৪৫৭) ভিত্তিতে সূরাকে সাবউল মাসানী (সাতটি আয়াতবিশিষ্ট বারবার পঠনীয় সূরা) বলা হয়েছে। তাই বিসমিল্লাহকে সূরা ফাতিহার অংশ হিসাবে অনেকেই গণ্য করেছেন। তবে বিসমিল্লাহ কেবল সূরা ফাতিহার অংশ বিশেষ না অন্য সমস্ত সূরারই অংশ বা কোনো সূরারই অংশ নয় বিষয়ে বিস্তর মতপার্থক্য রয়েছে (তাফসীর যাদুল মাসীর) আল্লাহ তাআলাই সঠিক জানেন।

একাকী হোক আর জামাআতে হোক সূরা ফাতিহার ক্বিরাআত করা জরুরী : বিষয়ে ওলামাদের তিনটি মতামত বর্ণিত হয়েছে

) স্বলাত যাহরী হোক আর সিররী কোনো অবস্থাতেই মুক্তাদী সূরা ফাতিহা কিরাআত করবে না তাদের দলীলসমূহ : দলীল নংযখন কুরআন তেলাওয়াত করা হয়, তখন তা মনোযোগ দিয়ে শোনো এবং চুপ থাকো-(সূরা আলআরাফ, আয়াত নং২০৪) এই আয়াতের প্রেক্ষাপটে কেউ কেউ মনে করেন যে, ইমামের পশ্চাতে সূরা ফাতিহার ক্বিরাআত করা সঠিক নয়। কিন্তু তাঁদের এই দাবী সঠিক নয়, কারণ প্রথমতঃ কুরআনের এই নির্দেশ আম বা অনির্দিষ্ট যা নাবী স্বল্লাল্লাহু আলাইহি সাল্লামের স্বহীহ হাদীস দ্বারা খাস বা নির্দিষ্ট হয়ে গিয়েছে। দ্বিতীয়তঃ কুরআন আল্লাহর রসূল স্বল্লাল্লাহু আলাইহি সাল্লামের উপর অবতীর্ণ হয়েছিল। বিধায় তিনিই সব থেকে বেশি কুরআনের অর্থ ভাবার্থ জানতেন। যদি কুরআনের এই আয়াতের মর্মার্থ হত যে, স্বলাতে ইমামের পিছনে সূরা ফাতিহা ক্বিরাআত করা যাবে না, তাহলে তিনি নিশ্চয় তা বলে দিতেন এবং স্বহীহ হাদীসে তা বর্ণিতও হত। তৃতীয়তঃ কুরআনের আম বা অনির্দিষ্ট হুকুমের উপর যদি আমল করাও যায়, তাহলে তো ১৭ রাকাআত ফরয স্বলাতের মধ্যে কেবলমাত্র রাকাআতেই ইমাম উচ্চ স্বরে ক্বিরাআত করেন। বাকী ১১ রাকাআতে তো ইমাম নিরবেই ক্বিরাআত করেন। তাহলে রাকাআতের উপর ক্বিয়াস করে ১৭ রাকাআতেই সূরা ফাতিহা ক্বিরাআত না করা কতটা যুক্তিযুক্ত? বিষয়ে বিস্তারিত জানতে ফিক্বহুল হাদীস অন্যান্য ফিক্বহের গ্রন্থসমূহ দেখুন। দলীল নং : ইমামের ক্বিরাআতই মুক্তাদির ক্বিরাআত (ইবনু মাজাহ৮৫০, যয়ীফ। অত্র হাদীসের সানাদে জাবির জুফী মিথ্যাবাদী রাবী) দলীল নং : যে ব্যক্তি সূরা ফাতিহা পড়ল না তার স্বলাত হবে না কিন্তু ইমামের পিছনে হলে তা স্বতন্ত্র বিষয় (সুনানুল কুবরা লিলবাইহাক্বী২৮৯৯ এই হাদীসটিও জাবির জুফীর কারণে যয়ীফ) দলীল নং : যে ব্যক্তি ইমামের পিছনে সূরা ফাতিহা ক্বিরাআত করল তার মুখ দুর্গন্ধে পূর্ণ হয়ে গেল বা তার মুখে আগুনের টুকরো প্রবেশ করল (মুরসাল, দলীলের যোগ্য নয়জুযউল ক্বিরাআহ : ইমাম বুখারী) বা ইমামের পিছনে সূরা ফাতিহা ক্বিরাআত করা যাবে না মর্মে বর্ণিত সমস্ত হাদীস আসার যয়ীফ অথবা মুরসাল অথবা জাল। যেগুলির একটিও দলীলের যোগ্য নয় (সিলসিলা যয়ীফা৫৯১)

 ) স্বলাত যাহরী হোক আর সিররী সর্বাবস্থাতেই মুক্তাদী সূরা ফাতিহা কিরাআত করতে হবে। এই মতটিই স্বহীহ হাদীসসম্মত। বিধায় এটিই সব থেকে বেশি সঠিক মত। কেননা নাবী সল্লাল্লাহু আলাইহি সাল্লাম বলেছেন যে ব্যক্তি সূরা ফাতিহা ক্বিরাআত করল না, তার স্বলাতই হল না (স্বহীহুল বুখারী, হাদীস নং৭৫৬) যে ব্যক্তি উম্মুল কুরআন অর্থাৎ সূরা ফাতিহা পড়ল না, তার স্বলাত অসম্পূর্ণ। অসম্পূর্ণ কথাটি তিনবার বলেন (স্বহীহ মুসলিম., হাদীস নং৩৯৫)  উবাদাহ বিন সামেত রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন : আমরা আল্লাহর রসূল স্বল্লাল্লাহু আলাইহি সাল্লামের পিছনে ফজরের স্বলাতে ছিলাম। নাবী স্বল্লাল্লাহু আলাইহি সাল্লামের নিকটে ক্বিরাআত ভারী মনে হল। তাই তিনি স্বল্লাল্লাহু আলাইহি সাল্লাম জিজ্ঞাসা করলেন : তোমরা কি ইমামের পিছনে ক্বিরাআত করছিলে? আমরা বললাম : হ্যাঁ, হে আল্লাহর রসূল!  তিনি বললেন: তোমরা সূরা ফাতিহা ব্যতীত অন্য কিছু ক্বিরাআত করবে না। কেননা সূরা ফাতিহা ব্যতীত স্বলাত  হয় না (আবূ দাঊদ : বাবু মান তারাকাল ক্বিরাআতা ফী স্বলাতিহী, হাদীস নং৮২৩, হাদীসটিকে আলবানী যয়ীফ বলেছেন কিন্তু যুবায়ের আলী যায়ী হাদীসটিকে স্বহীহ বলেছেন, মুসনাদ আহমাদ, হাদীস নং২২৬৯৪, স্বহীহ লেগাইরিহিশুয়ায়েব আলআরনাঊত, স্বহীহ ইবনু খুযাইমা, হাদীস নং১৫৮১ স্বহীহ ইবনু হিব্বান, হাদীস নং১৭৮৫)

) যাহরী ক্বিরাআত হলে মুক্তাদী সূরা ফাতিহা ক্বিরাআত করবে না কিন্তু সিররী হলে সূরা ফাতিহা ক্বিরাআত করবে সূরা আল আরাফের ২০৪ নং আয়াত এবং ইমামের ক্বিরাআতই মুক্তাদীর ক্বিরাআত মর্মে বর্ণিত দূর্বল হাদীসগুলি থেকে কিছু কিছু আলেম উক্ত মতামত ব্যক্ত করেছেন। তাঁদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী মোট ১৭ রাকাআত ফরয স্বলাতের মধ্যে রাকাআতে ইমাম যাহরী ক্বিরাআত করেন। সুতরাং  কেবলমাত্র উক্ত রাকাআতেই মুক্তাদী সূরা ফাতিহা ইমামের পিছনে ক্বিরাআত করবে না। কিন্তু বাকী ১১ রাকাআতে ইমামের পিছনে মুক্তাদী অবশ্যই সূরা ফাতিহা তেলাওয়াত করবে মনে মনে।

আল্লাহ বান্দার মাঝে বিভক্ত সালাত : হাদীসে কুদসীর আলোয় সূরা ফাতিহার তাৎপর্য।

আবূ হুরায়রা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যে ব্যক্তি সালাত আদায় করল (অথচ) তাতে উম্মুল কুরআন পাঠ করল না সে সালাত হবে অসম্পূর্ণ। তিনি তিনবার এটা বললেন। অতঃপর আবূ হুরায়রা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) কে জিজ্ঞাসা করা হল, আমরা তো ইমামের পেছনে থাকি (তখনো কি ফাতিহা পড়ব?) তিনি বললেন, তখন মনে মনে তা পড়। কারণ আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছি যে, আল্লাহ তাআলা বলেন, আমি সলাতকে আমার আমার বান্দার মধ্যে অর্ধেক করে ভাগ করেছি। আর বান্দা যা চাইবে তা সে পাবে। অতঃপর বান্দা যখন বলে, الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ (সমস্ত প্রশংসা বিশ্ব জগতসমূহের প্রতিপালক আল্লাহরই প্রাপ্য); আল্লাহ তাআলা এর জবাবে বলেন, আমার বান্দা আমার প্রশংসা করেছে। সে যখন বলে, الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ (তিনি দয়াময়, পরম দয়ালু); আল্লাহ তাআলা বলেন, আমার বান্দা আমার গুনাবলী বর্ণনা করেছে, গুণগান করেছে। অতঃপর সে যখন বলে, مَالِكِ يَوْمِ الدِّينِ‏ (কর্মফল দিবসের মালিক), তিনি বলেন, আমার বান্দা আমার মাহাত্ম্য বর্ণনা করেছে। আর কখনো বলেছেন, আমার বান্দা (তার সব কাজ) আমার উপর সোপর্দ করেছে। সে যখন বলে, إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ (আমরা শুধু তোমারই ইবাদত করি এবং তোমারই কাছে সাহায্য প্রার্থনা করি); তিনি বলেনএটা আমার এবং আমার বান্দার মধ্যকার ব্যাপার। আমার বান্দা যা চাইবে তা সে পাবে। যখন সে বলে, اهْدِنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقِيمَ * صِرَاطَ الَّذِينَ أَنْعَمْتَ عَلَيْهِمْ غَيْرِ الْمَغْضُوبِ عَلَيْهِمْ وَلاَ الضَّالِّينَ‏ (আমাদের সরল পথ প্রদর্শন কর, তাদের পথে যাদেরকে তুমি অনুগ্রহ দান করেছ, যারা ক্রোধ নিপতিত নয়, পথভ্রষ্টও নয়); তখন তিনি বলেন, এটা কেবল আমার বান্দার জন্য। আমার বান্দা যা চায় তা সে পাবে (সহীহ মুসলিম৩৯৫)

সমগ্র কুরআনের নির্যাস সূরা ফাতিহায় তাওহীদ, আখেরাত রিসালাতের অনন্য মেলবন্ধন : অত্র সূরাতে ইসলামের মৌলিক বিষয় তাওহীদ, আখেরাত রিসালাতকে সংক্ষিপ্তাকারে অথচ সুন্দরভাবে বর্ণনা করা হয়েছে।   الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ   (2) আলহামদু লিল্লাহি রাব্বিল আলামীন থেকে তাওহীদুর রুবুবিয়্যাহ,  الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ (3) আর রাহমানির রাহীম থেকে তাওহীদুল আসমা ওয়াসসিফাত, إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ (5) اهْدِنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقِيمَ (6) ইইয়্যাকানাবুদু ইইয়্যাকানাস তায়ীন.মুস্তাক্বীম থেকে তাওহীদুল উলূহিয়্যাহ বা ইবাদত, مَالِكِ يَوْمِ الدِّينِ (4)  মালিক ইয়াওমিদ দ্বীন থেকে আখেরাত এবং   صِرَاطَ الَّذِينَ أَنْعَمْتَ عَلَيْهِمْ غَيْرِ الْمَغْضُوبِ عَلَيْهِمْ وَلَا الضَّالِّينَ (7) সিরাতাল্লাযীনা……….ওয়াযযল্লীন থেকে রসূলদের অনুগতদের জন্য পুরস্কার অমান্যকারীদের জন্য পরিণাম বর্ণিত হয়েছে (অর্থাৎ রিসালাত) এভাবে সমগ্রকুরআনের মূল প্রতিপাদ্য বিষয় সূরা ফাতিহাতে বর্ণিত হয়েছে। জন্যসূরা ফাতিহাকে উম্মুল কুরআন বা কুরআনের জননী বলা হয়  (সহীহ বুখারী৪৭০৪)

() মাক্কী মাদানী সূরার সংজ্ঞার বিষয়ে দুটি বহুল প্রচলিত মত রয়েছে :

 ) মাক্কী সূরা :  যে সমস্ত সূরা আল্লাহর রসূল স্বল্লাল্লাহু আলাইহি সাল্লামের হিজরতের পূর্বে অবতীর্ণ হয়েছে সেগুলিকেও মাক্কী সূরা বলা হয় যদিও সেগুলি মক্কা ব্যতীত অন্য কোনো স্থানেও অবতীর্ণ হয়েছে।

 মাদানী সূরা : যে সমস্ত সূরা হিজরতের পরে অবতীর্ণ হয়েছে সেগুলিকে মাদানী সূরা বলা হয় যদিও মক্কাতে অবতীর্ণ হয়েছে।

) মাক্কী সূরা: যে সমস্ত সূরা মক্কায় অবতীর্ণ হয়েছে সেগুলিকে মাক্কী সূরা বলা হয় যদিও হিজরতের পর অবতীর্ণ হয়েছে।

মাদানী সূরা : যে সমস্ত সূরা মদীনায় অবতীর্ণ হয়েছে সেগুলিকে মাদানী সূরা বলা হয়।

উল্লিখিত দুটি সংজ্ঞার মধ্যে প্রথমটিই সব থেকে বেশি গ্রহণযোগ্য। আল্লাহই সঠিক জানেন। [মাক্কী মাদানী সূরা সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে ফাহদুর রূমীর লিখিত গ্রন্থ দেরাসাত ফী উলূমিল কুরআন এবং শাফাআত রাব্বানী লিখিত আলমাক্কী ওয়ালমাদানী গ্রন্থ দেখুন। তাছাড়া তাফসীর গ্রন্থ উলূমুল কুরআন বিষয়ক গ্রন্থাবলীও দেখা যেতে পারে।]

মাক্কী মাদানী সূরা জানার উপকারিতা :

  • ) নাসিখ মানসূখ জানা যায়। মাদানী সূরা আয়াত নাসিখ কেননা এগুলি শেষে অবতীর্ণ হয়েছে এবং মাক্কী সূরা আয়াত মানসূখ কেননা এগুলি প্রথমে অবতীর্ণ হয়েছে।
  •  ) কুরআনের তাফসীর করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। অবতীর্ণের স্থান জানা থাকলে আয়াতের ভাবার্থ বিশ্লেষণ করতে সুবিধা হয়।
  • ) নাবী স্বল্লাল্লাহু আলাইহি সাল্লামের মাক্কী মাদানী জীবনে দাআতী কার্যকলাপের বিভিন্ন পর্যায় সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান লাভ করা যায়।
  • ) কুরআন সংরক্ষণ করার বিষয়ে মুসলিমদের সচেতনতা সম্পর্কে জানা যায়। কেননা তারা কেবল কুরআনের আয়াতই মুখস্ত করেনি বরং তারা যত্নের সঙ্গে সংরক্ষণ করেছেন কুরআনের অবতীর্ণের স্থান, সময় অর্থাৎ হিজরতের পূর্বে না পরে, রাতে না দিনে, গরমকালে না শীতকালে।
  • ) অবতীর্ণের কারণ সম্পর্কেও অবহিত হওয়া যায়।
  • ) জানা যায় যে, পরিবর্তন, পরিবর্ধন, সংযোজন বিয়োজন ছাড়াই সঠিকভাবে আমাদের নিকটে কুরআনে পৌঁছেছে (আলমাক্কী ওয়ালমাদানীশাফাআত রাব্বানী)

() রববাংলা ভাষায় রবএর অনুবাদ বা ভাবানুবাদ একটি শব্দে করা কঠিন। কেননা রব বলতে এমন এক সত্তাকে বোঝায় যিনি সৃষ্টি করেন, ধ্বংস করেন, জীবন দান করেন, মৃত্যু দেন, প্রতিপালন করেন, জীবিকা দান করেন এবং তিনি রকম আরো অসংখ্য গুণে সম্পূর্ণরূপে গুণান্বিত (সহায়ক আয়াত /২১২২, /) উক্ত গুণসমূহে তিনি এক অদ্বিতীয়, অন্য কোনো সত্তা অংশীদার নয়। তাই রবে অনুবাদ রব করাই বেশি সঠিক। রব সম্পর্কিত আলোচনাকেই তাওহীদুর রুবুবিয়্যাত বলা হয়।

() সিরাতে মুসতাক্বীম : সিরাতে মুসতাক্বীমের বাংলা অনুবাদ হল সরল পথ বা সোজা পথ। সিরাতে মুসতাক্বীম হল আল্লাহর মনোনীত পথযে পথে সমস্ত নাবী, রসূল, সিদ্দীক্ব, সলেহ শহীদগণ পরিচালিত হয়েছেন (/৬৯) কুরআনে িসরাতে মুস্তাকীমের বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে। কোথায়  সিরাতে মুস্তাক্বীমের পথিকদের, কোথাও তাদের কার্যকলাপের, কোথাও তাদের মুসিবত কসরতের, কোথাও তাদের বিজয়ের, কোথাও তাদের অন্তিম শুভপ্রাপ্তির বিবরণ রয়েছে। আবার কোথাও সিরাতে মুস্তাক্বীম থেকে বিচ্যুত পথিকদের, তাদের পরাজয়ের আখেরাতের ভয়ংকর পরিণামের বিবরণ রয়েছে। সূরা ফাতিহাতে সম্পূর্ণ কুরআনের মুখ্য ভাবার্থ সারমর্ম বর্ণিত হয়েছে। জন্যই সূরা ফাতিহাকে উম্মূল কুরআন বা কুরআনের জননী বলা হয়। মানুষের প্রকাশ্য শত্রু ইবলীস ক্রমাগত মানুষকে সিরাতে মুস্তাক্বীম থেকে বিভ্রান্ত বিচ্যুত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে (/১৬১৭) তাই আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাদেরকে প্রতিনিয়ত সলাতে সূরা ফাতিহা তেলাওয়াতের মাধ্যমে সিরাতে মুস্তাক্বীম প্রার্থনা করাকে বাধ্যতামূলক করেছেন।

() দ্বিতীয় অর্থ () : তাদের পথে, যাদের প্রতি তুমি অনুগ্রহ করেছ। তাদের পথে নয় যাদের প্রতি অভিসম্পাত করা হয়েছে এবং যারা পথভ্রষ্ট (অর্থাৎ ইহুদি খ্রীষ্টানদের পথে নয়)

() নং আয়াতের দুটি অর্থই সঠিক। তবে উভয়ের ব্যাখ্যা বা বিশ্লেষণের কিছুটা পার্থক্য রয়েছে। তা হল প্রথম অর্থে গাইরিল মাগযূবে আলাইহিম অলায যাললীনবলতে যাঁদের প্রতি অনুগ্রহ করা হয়েছে, তাঁদের দুটি বৈশিষ্ট্যকে বোঝানো হয়েছে : ) তাঁরা আল্লাহর ক্রোধের শিকার হননি এবং ) তাঁরা পথভ্রষ্টও নন-(ফাতহুল কাদীর) এই অর্থে মূসা ঈসা আলাাইহিমাস সালামের উপর ঈমান আনয়নকারী সমস্ত ইহুদি   খ্রীষ্টানদেরকেও শামিল করা যেতে পারে, যারা আল্লাহর গযব ভ্রষ্টতা থেকে মুক্ত ছিল (/৬৯)  দ্বিতীয় অর্থে গাইরিল মাগযূবে আলাইহিম অলায যাললীনবলতে অভিশপ্ত পথভ্রষ্ট সমস্ত ইহুদি খ্রীষ্টানদেরক বোঝানো হয়েছে, যারা নিজেদের রসূলদের আনুগত্য না করে সিরাতে মুস্তাকীম বা সরল পথ থেকে বিচ্যুত হয়েছে-(ইবনু কাসীর) তবে প্রথম অর্থটাই বেশি সঠিক বলে মনে হচ্ছে। কেননা এই আয়াতে সিরাতে মুস্তাকীমেরই বিবরণ দেওয়া হচ্ছে। আল্লাহই সঠিক জানেন।

বিশেষ ফযিলত: আল্লাহর রসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি সাল্লামের বেশ কয়েকজন সাহাবী রাযিয়াল্লাহু আনহুম কোনো এক সফরে ছিলেন। তাঁরা আরবের একটি গোত্রের নিকটে হাজির হলেন এবং তাদের নিকটে আতিথেয়তা প্রার্থনা করলেন। কিন্তু তারা তাঁদের মেহমানদারী করতে রাজী হল না। অবশেষে তারা সাহাবীদেরকে বলল যে, তাদের গোত্রপতিকে সাপে দংশন করেছে।  আপনাদের মধ্যে কি কেউ ঝাড় ফুঁক করতে জানেন ? একজন সাহাবী রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন : জি, হ্যাঁ। অতঃপর তিনি সূরা ফাতিহা পড়ে তাকে ফুঁক দিলেন এবং তিনি সুস্থ হয়ে উঠলেন…………(সহীহ মুসলিম : বাবু জাওয়াযে আখযিল উজরাতে আলার রুকিয়্যাহ বিল কুরআন ওয়াল আযকার, হাদীস নং২২০১) বোঝা গেল যে, সূরা ফাতিহা পড়ে ঝাড়ফুঁক করা যাবে। তবে কোনো প্রকার সূতোতে ফুঁ দিয়ে গিরা লাগানো যাবে না (১১৩/) সূরা ফাতিহা তিলাওয়াত করে পানিতে ফুঁ দেওয়া যাবে এবং সেই পানিতে কোনো অঙ্গ প্রত্যঙ্গ ধোয়া যাবে বা গোসল করা যাবে কিন্তু পান করা যাবে না। কারণ নাবী সল্লাল্লাহু আলাইহি সাল্লাম বলেছেন যখন তোমরা পান করবে, তখন তোমরা পানপাত্রে নিঃশ্বা ফেলবে না (সহীহুল বুখারী : বাবুন নাহীয়ে আনিত তানাফফুসে ফিল ইনা, হাদীস নং৫৬৩০)

মোঃ তাজাম্মুল হক সালাফী, পশ্চিমবাংলা, ভারত

 

 

 

Leave a Reply