সূরা আল আনআ‘মের ১২৫ নং আয়াতের তাফসীর

মো: তাজাম্মুল হক সালাফী

إِنَّ الْحَمْدَ لِلَّهِ، وَالصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ عَلَى رَسُولِ اللَّهِ فاعوذ بالله من الشيطان الرجيم  بِسۡمِ ٱللَّهِ ٱلرَّحۡمَٰنِ ٱلرَّحِيمِ- فَمَنْ يُرِدِ اللَّهُ أَنْ يَهْدِيَهُ يَشْرَحْ صَدْرَهُ لِلْإِسْلَامِ وَمَنْ يُرِدْ أَنْ يُضِلَّهُ يَجْعَلْ صَدْرَهُ ضَيِّقًا حَرَجًا كَأَنَّمَا يَصَّعَّدُ فِي السَّمَاءِ كَذَلِكَ يَجْعَلُ اللَّهُ الرِّجْسَ عَلَى الَّذِينَ لَا يُؤْمِنُونَ (125)

আল্লাহ তাআলা বলেন-

فَمَنْ يُرِدِ اللَّهُ أَنْ يَهْدِيَهُ يَشْرَحْ صَدْرَهُ لِلْإِسْلَامِ وَمَنْ يُرِدْ أَنْ يُضِلَّهُ يَجْعَلْ صَدْرَهُ ضَيِّقًا حَرَجًا كَأَنَّمَا يَصَّعَّدُ فِي السَّمَاءِ كَذَلِكَ يَجْعَلُ اللَّهُ الرِّجْسَ عَلَى الَّذِينَ لَا يُؤْمِنُونَ (125)

) আয়াতের অনুবাদ ও শাব্দিক বিশ্লেষণ :

 “ সুতরাং আল্লাহ যাকে হেদায়েত করার ইচ্ছা করেন, তার বক্ষকে ইসলামের জন্য উন্মুক্ত করে দেন। আর যাকে গোমরাহ করার ইচ্ছা করেন, তার বক্ষকে সংকীর্ণ ও অতিশয় সংকীর্ণ করে দেন, মনে হয় সে আকাশে আরোহণ করছে। এভাবেই যারা ঈমান আনে না আল্লাহ তাদের ওপর অপবিত্রতা (লজ্জাজনক শাস্তি) চাপিয়ে দেন।”

  • يَشْرَحْ صَدْرَهُ (বক্ষ উন্মুক্ত করা) : ‘শরহ’ শব্দের অর্থ বিস্তৃত করা বা উন্মুক্ত করা। ইসলামের পরিভাষায় এর অর্থ— অন্তরে সত্যকে গ্রহণ করার জন্য যোগ্যতা ও প্রশান্তি তৈরি করা।
  • ضَيِّقًا حَرَجًا (সংকীর্ণ ও অতিশয় সংকীর্ণ) : ‘হারাজান’ এমন সংকীর্ণতাকে বোঝায় যেখানে কোনো কিছু প্রবেশের সামান্যতম স্থানও থাকে না। অর্থাৎ, সত্যের আলো প্রবেশের পথ পুরোপুরি রুদ্ধ হয়ে যাওয়া।
  • يَصَّعَّدُ فِي السَّمَاءِ (আকাশে আরোহণ করা) : এটি একটি অনন্য উপমা, যা বৈজ্ঞানিক ও মনস্তাত্ত্বিক দিক থেকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

২) কুরআনের অন্যান্য আয়াতের দ্বারা তাফসীর (تفسير القرآن بالقرآن)  : কুরআনের অন্যান্য আয়াতেও ঈমান ও কুফরের এই মনস্তাত্ত্বিক অবস্থাকে সমর্থন করা হয়েছে।

হিদায়েতপ্রাপ্তদের অবস্থা সম্পর্কে  : সূরা আজ-জুমারের ২২ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন—

 أَفَمَنْ شَرَحَ اللَّهُ صَدْرَهُ لِلْإِسْلَامِ فَهُوَ عَلَى نُورٍ مِنْ رَبِّهِ فَوَيْلٌ لِلْقَاسِيَةِ قُلُوبُهُمْ مِنْ ذِكْرِ اللَّهِ أُولَئِكَ فِي ضَلَالٍ مُبِينٍ (22)

আল্লাহ যার বক্ষ ইসলামের জন্য উন্মুক্ত করে দিয়েছেন, ফলে সে তার রবের পক্ষ থেকে আসা নূরের ওপর রয়েছে (সে কি তার সমান, যে এমন নয়?)”

গুমরাহীদের অন্ধত্ব সম্পর্কেঃ  সূরা আল-হজ্জের ৪৬ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে—

 أَفَلَمْ يَسِيرُوا فِي الْأَرْضِ فَتَكُونَ لَهُمْ قُلُوبٌ يَعْقِلُونَ بِهَا أَوْ آذَانٌ يَسْمَعُونَ بِهَا فَإِنَّهَا لَا تَعْمَى الْأَبْصَارُ وَلَكِنْ تَعْمَى الْقُلُوبُ الَّتِي فِي الصُّدُورِ (46)

“তারা কি যমীনে ভ্রমণ করেনি? তাহলে তাদের হত এমন হৃদয় যা দ্বারা তারা উপলব্ধি করতে পারত এবং এমন কান যা দ্বারা তারা শুনতে পারত। বস্ত্তত চোখ তো অন্ধ হয় না, বরং অন্ধ হয় বক্ষস্থিত হৃদয়।”

৩) হাদীস দ্বারা আয়াতের তাফসীর : আল্লাহ যার বক্ষ ইসলামের জন্য উন্মুক্ত করে দেন, সে ঈমানের এক বিশেষ স্বাদ ও মাধুর্য অনুভব করে। এই প্রসঙ্গে সহীহ বুখারী ও মুসলিমের বিখ্যাত হাদীস: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন-

 ثَلاَثٌ مَنْ كُنَّ فِيهِ وَجَدَ حَلاَوَةَ الإِيمَانِ: أَنْ يَكُونَ اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِمَّا سِوَاهُمَا، وَأَنْ يُحِبَّ المَرْءَ لاَ يُحِبُّهُ إِلَّا لِلَّهِ، وَأَنْ يَكْرَهَ أَنْ يَعُودَ فِي الكُفْرِ كَمَا يَكْرَهُ أَنْ يُقْذَفَ فِي النَّارِ “

“তিনটি গুণ যার মধ্যে থাকবে, সে ঈমানের স্বাদ পাবে— ক) আল্লাহ ও তাঁর রাসূল তার কাছে অন্য সব কিছুর চেয়ে প্রিয় হওয়া, খ) কোনো মানুষকে কেবল আল্লাহর জন্যই ভালোবাসা, এবং গ) কুফরীতে ফিরে যাওয়াকে আগুনে নিক্ষিপ্ত হওয়ার মতোই অপছন্দ করা।” (সহীহ বুখারী, হাদীস নম্বর: ১৬)।

আয়াতের দ্বিতীয় অংশে বলা হয়েছে, আল্লাহ যাকে গোমরাহ করতে চান তার বক্ষ সংকীর্ণ করে দেন। কারণ অন্তর সম্পূর্ণ আল্লাহর নিয়ন্ত্রণে। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন-

 إِنَّ قُلُوبَ بَنِي آدَمَ كُلَّهَا بَيْنَ إِصْبَعَيْنِ مِنْ أَصَابِعِ الرَّحْمَنِ، كَقَلْبٍ وَاحِدٍ، يُصَرِّفُهُ حَيْثُ يَشَاءُ» ثُمَّ قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «اللهُمَّ مُصَرِّفَ الْقُلُوبِ صَرِّفْ قُلُوبَنَا عَلَى طَاعَتِكَ»

নিশ্চয়ই আদম সন্তানের সমস্ত অন্তর পরম দয়াময় আল্লাহর দুই আঙুলের মাঝে একটিমাত্র অন্তরের মতো। তিনি যেভাবে ইচ্ছা তা ওলট-পালট করেন।” এরপর রাসূলুল্লাহ (সা.) এই দুআটি করতেন: “আল্লাহুম্মা মুসাররিফাল কুলূবি সাররিফ কুলূবানা ‘আলা ত্বা’আতিক” হে অন্তরসমূহ ওলট-পালটকারী আল্লাহ! আমাদের অন্তরগুলোকে আপনার আনুগত্যের দিকে ফিরিয়ে দিন।” (সহীহ মুসলিম, হাদীস নম্বর: ২৬৫৪)

আয়াতে অবিশ্বাসী ও গোমরাহদের বক্ষ “সংকীর্ণ ও অতিশয় সংকীর্ণ” হওয়ার কথা বলা হয়েছে। পাপ এবং কুফর কীভাবে মানুষের বক্ষকে সংকুচিত ও অশান্ত করে তোলে, তার চমৎকার সংজ্ঞা দিয়েছেন নবীজী (সা.): রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে পুণ্য এবং পাপ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন-

«الْبِرُّ حُسْنُ الْخُلُقِ، وَالْإِثْمُ مَا حَاكَ فِي صَدْرِكَ، وَكَرِهْتَ أَنْ يَطَّلِعَ عَلَيْهِ النَّاسُ»

 পুণ্য হলো উত্তম চরিত্র। আর পাপ হলো যা তোমার অন্তরে খটকা বা সংকীর্ণতা তৈরি করে এবং মানুষ তা জেনে ফেলুক— এটা তুমি অপছন্দ করো।” (সহীহ মুসলিম, হাদীস নম্বর: ২৫৫৩)

) বৈজ্ঞানিক ও অলৌকিক বিশ্লেষণ (Scientific Miracle) : আয়াতের “মনে হয় সে আকাশে আরোহণ করছে” বাক্যটি কুরআনের একটি অনন্য বৈজ্ঞানিক অলৌকিকত্ব (Scientific Miracle)। আজকের আধুনিক বিজ্ঞান প্রমাণ করেছে যে, মানুষ যখন ভূপৃষ্ঠ থেকে যত উপরের দিকে (আকাশে) উঠতে থাকে, বায়ুমণ্ডলের চাপ ততই কমতে থাকে এবং অক্সিজেনের অভাব ঘটে। এর ফলে মানুষের ফুসফুস ও বক্ষ সংকুচিত হয়ে আসে এবং দম আটকে যাওয়ার মতো তীব্র কষ্টদায়ক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। আজ থেকে ১৪০০ বছর আগে যখন কোনো বিমান বা মহাকাশযান ছিল না, তখন আরবের মরুভূমিতে বসে এই শ্বাসনালীর সংকোচন ও অক্সিজেনের অভাবজনিত কষ্টের নিখুঁত রূপক তুলে ধরা একমাত্র আল্লাহর ঐশী বাণী ছাড়া অসম্ভব।

) আল্লাহ কেন কাউকে গোমরাহ বা পথভ্রষ্ট করেন? আয়াতে বলা হয়েছে, “যাকে গোমরাহ করার ইচ্ছা করেন, তার বক্ষ সংকীর্ণ করে দেন।” এখানে মনে হতে পারে আল্লাহ নিজেই জোর করে মানুষকে পথভ্রষ্ট করছেন। কিন্তু কুরআনের সামগ্রিক বিধান অনুযায়ী, আল্লাহ কাউকে ইচ্ছাকৃতভাবে বা জোরপূর্বক গোমরাহ করেন না।মানুষ যখন নিজের অহংকার, কুপ্রবৃত্তি এবং একগুঁয়েমির কারণে সত্যকে বারবার প্রত্যাখ্যান করে, তখন শাস্তি হিসেবে আল্লাহ তার হেদায়েতের তাওফীক কেড়ে নেন এবং তার অন্তরে মোহর মেরে দেন। আয়াতের শেষাংশেই এর কারণ স্পষ্ট করা হয়েছে: “এভাবেই যারা ঈমান আনে না আল্লাহ তাদের ওপর অপবিত্রতা (লাঞ্ছনা) চাপিয়ে দেন।” অর্থাৎ, তাদের অবাধ্যতা ও অবিশ্বাসের কারণেই তাদের বক্ষ সংকীর্ণ হয়।

এই আয়াত থেকে আমরা বুঝতে পারি যে, ইসলামের বিধানগুলো সহজে পালন করতে পারা এবং দীনের ওপর চলতে পেরে আনন্দ পাওয়া আল্লাহর পক্ষ থেকে এক বিশাল নেয়ামত ও হেদায়েতের লক্ষণ। পক্ষান্তরে, নেক কাজ করতে কষ্ট হওয়া বা দ্বীনের কথা শুনলে মন মেজাজ খিটখিটে হওয়া অন্তরের ব্যাধি ও গোমরাহীর লক্ষণ।

পরিশেষে বলা যায়, সূরা আল-আনআমের ১২৫ নম্বর আয়াত এবং এর ব্যাখ্যায় বর্ণিত হাদিসটি মুমিনের আত্মিক উৎকর্ষ ও সফলতার এক শাশ্বত দিকনির্দেশনা। আল্লাহর হেদায়াত কোনো জোরপূর্বক বিষয় নয়, বরং এটি হলো বান্দার অন্তরে মহান আল্লাহর আলোর (নূর) প্রবেশ, যা মানুষের সংকীর্ণ মনস্তত্ত্বকে চিরস্থায়ী কল্যাণের দিকে প্রসারিত করে। বক্ষ উন্মুক্ত (শারহুস সাদর) হওয়ার এই আধ্যাত্মিক অবস্থা কেবল তাত্ত্বিক নয়, বরং এর বাস্তব প্রতিফলন ঘটে মানুষের আচরণে। হে আল্লাহ! তুমি আমাদের বক্ষকে ঈমানের জন্য উম্মুক্ত করে দাও, আমীন। وَآخِرُ دَعْوَانَا أَنِ الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِين

Leave a Reply