ঘুম থেকে জেগে উঠার আদব
লেখক : তাজাম্মুল হক সালাফী
اَلسَّلَامُ عَلَيْكُمْ وَرَحْمَةُ اللهِ وَبَرَكَاتُهُ- إِنَّ الْحَمْدَ لِلَّهِ، وَالصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ عَلَى رَسُولِ اللَّهِ فاعوذ بالله من الشيطان الرجيم بِسۡمِ ٱللَّهِ ٱلرَّحۡمَٰنِ ٱلرَّحِيمِ-اللَّهُ يَتَوَفَّى الْأَنْفُسَ حِينَ مَوْتِهَا وَالَّتِي لَمْ تَمُتْ فِي مَنَامِهَا فَيُمْسِكُ الَّتِي قَضَى عَلَيْهَا الْمَوْتَ وَيُرْسِلُ الْأُخْرَى إِلَى أَجَلٍ مُسَمًّى إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآيَاتٍ لِقَوْمٍ يَتَفَكَّرُونَ (42)
প্রতিটি সকাল আমাদের জীবনে কেবল একটি নতুন দিনের সূচনা নয়, বরং মহান আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে নতুন করে জীবন পাওয়ার এক মহা নিয়ামত। রাতের অন্ধকার ঘুমে যখন মানুষ অবচেতন হয়ে পড়ে, তখন তার জীবন ও শ্বাস-প্রশ্বাসের ওপর কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকে না। সেই অবচেতন অবস্থা থেকে সুস্থ-সবলভাবে আমাদের আবার সজাগ করা এবং নতুন একটি দিনের আলো দেখার তাওফিক পাওয়া আল্লাহর এক অসীম দয়া ও জীবন্ত নিয়ামত। আল্লাহ তাআলা বলেন-
اللَّهُ يَتَوَفَّى الْأَنْفُسَ حِينَ مَوْتِهَا وَالَّتِي لَمْ تَمُتْ فِي مَنَامِهَا فَيُمْسِكُ الَّتِي قَضَى عَلَيْهَا الْمَوْتَ وَيُرْسِلُ الْأُخْرَى إِلَى أَجَلٍ مُسَمًّى إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآيَاتٍ لِقَوْمٍ يَتَفَكَّرُونَ (42)
আল্লাহ জীবসমূহের প্রাণ হরণ করেন তাদের মৃত্যুর সময় এবং যারা মরেনি তাদের নিদ্রার সময়। তারপর যার জন্য তিনি মৃত্যুর ফয়সালা করেন তার প্রাণ তিনি রেখে দেন এবং অন্যগুলো ফিরিয়ে দেন একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত। নিশ্চয় এতে চিন্তাশীল কওমের জন্য অনেক নিদর্শন রয়েছে। সূরা যুমার-৪২।
ইসলামে ঘুম থেকে ওঠার পর দিনটি বরকতময় করার জন্য বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাহ ও আদব রয়েছে। আদবগুলি হল-
১) ঘুম থেকে উঠেই দুআর মাধ্যমে আল্লাহর প্রশংসা করা : ঘুমকে ছোট মৃত্যু বলা হয়। তাই নতুন জীবন পেয়ে প্রথমেই আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করা সুন্নাত। আল্লাহর রসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-
«الحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي أَحْيَانَا بَعْدَ مَا أَمَاتَنَا وَإِلَيْهِ النُّشُورُ»
উচ্চারণ: “আলহামদুলিল্লাহিল্লাজি আহইয়ানা বা’দা মা আমাতানা ওয়া ইলাইহিন নুশুর।”
অর্থ: “সব প্রশংসা সেই আল্লাহর, যিনি মৃত্যুর (ঘুমের) পর আমাদের জীবিত করলেন এবং তাঁর দিকেই সবার ফিরে যেতে হবে।” (সহিহ বুখারি, হাদিস-৬৩১২)
২) হাত দিয়ে মুখের ঘুম-ভাব মুছে ফেলতে হবে : জাগ্রত হওয়ার পর হাত দিয়ে মুখের অলসতা বা ঘুমের ভাব দূর করা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নিয়মিত অভ্যাস ছিল।
اسْتَيْقَظَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَجَعَلَ يَمْسَحُ النَّوْمَ عَنْ وَجْهِهِ بِيَدِهِ
ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি একবার রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ঘরে রাত্রিযাপন করেছিলেন। তিনি বলেন,”রাসুলুল্লাহ (সা.) রাত গভীর হলে ঘুম থেকে উঠলেন এবং বিছানায় বসে তাঁর হাত দিয়ে মুখের ঘুমের ভাব মুছতে লাগলেন।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৭৬৩/১৮২)।
৩) সুরা আল-ইমরানের শেষ ১০ আয়াত তিলাওয়াত করা :
ثُمَّ قَرَأَ الْعَشْرَ الْآيَاتِ الْخَوَاتِمَ مِنْ سُورَةِ آلِ عِمْرَانَ
এরপর তিনি সূরা আলে-ইমরানের সর্বশেষ দশটি আয়াত পাঠ করেন (সহীহ মুসলিম-৭৬৩/১৮২)।
৪) মিসওয়াক বা দাঁত পরিষ্কার করা : ঘুমের কারণে মুখে যে দুর্গন্ধ বা জড়তা তৈরি হয়, তা দূর করার জন্য ঘুম থেকে উঠেই দাঁত পরিষ্কার করা সুন্নাত।
«إِذَا قَامَ مِنَ اللَّيْلِ، يَشُوصُ فَاهُ بِالسِّوَاكِ»
হুযাইফা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,”রাসুলুল্লাহ (সা.) যখন রাতে (তাহাজ্জুদ বা সুবহে সাদিকের সময়) ঘুম থেকে উঠতেন, তখন মিসওয়াক দিয়ে নিজের মুখ পরিষ্কার করতেন।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৪৫)
৫) তিনবার নাক ঝেড়ে পরিষ্কার করা : ঘুমন্ত অবস্থায় শয়তান মানুষের নাকের বাঁশিতে অবস্থান করে। তাই ঘুম থেকে উঠে ওজুর সময় বা তার আগে ভালো করে নাক পরিষ্কার করা উচিত। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন-
«إِذَا اسْتَيْقَظَ أُرَاهُ أَحَدُكُمْ مِنْ مَنَامِهِ فَتَوَضَّأَ فَلْيَسْتَنْثِرْ ثَلاَثًا، فَإِنَّ الشَّيْطَانَ يَبِيتُ عَلَى خَيْشُومِهِ»
তোমাদের কেউ যখন ঘুম থেকে জেগে ওঠে (এবং ওযূ করে), সে যেন তিনবার নাক ঝেড়ে ফেলে। কারণ, শয়তান তার নাকের ছিদ্রের ভেতর রাত যাপন করে।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩২৯৫)
৬) পাত্রে হাত ডোবানোর আগে হাত ধোয়া : ঘুম থেকে ওঠার পর হাত ভালো করে না ধুয়ে কোনো পানির পাত্র বা খাবারের পাত্রে হাত দেওয়া নিষেধ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন-
«إِذَا اسْتَيْقَظَ أَحَدُكُمْ مِنْ نَوْمِهِ، فَلَا يَغْمِسْ يَدَهُ فِي الْإِنَاءِ حَتَّى يَغْسِلَهَا ثَلَاثًا، فَإِنَّهُ لَا يَدْرِي أَيْنَ بَاتَتْ يَدُهُ»
তোমাদের কেউ যখন ঘুম থেকে জাগে, সে যেন পাত্রে হাত প্রবেশ করানোর আগে তিনবার তার হাত ধুয়ে নেয়। কারণ, সে জানে না রাতভর তার হাত কোথায় ছিল।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস- ২৭৮)
৭) শয়তানের ৩টি বাঁধন খুলে ফেলা (জিকির, ওযূ ও সালাত) মানুষ যখন ঘুমায়, শয়তান তার ঘাড়ে তিনটি গিট দেয়। ঘুম থেকে ওঠার পর তিনটি কাজ করলে এই গিটগুলো খুলে যায় এবং সারাদিন মন প্রফুল্ল থাকে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন-
«يَعْقِدُ الشَّيْطَانُ عَلَى قَافِيَةِ رَأْسِ أَحَدِكُمْ إِذَا هُوَ نَامَ ثَلاَثَ عُقَدٍ يَضْرِبُ كُلَّ عُقْدَةٍ عَلَيْكَ لَيْلٌ طَوِيلٌ، فَارْقُدْ فَإِنِ اسْتَيْقَظَ فَذَكَرَ اللَّهَ، انْحَلَّتْ عُقْدَةٌ، فَإِنْ تَوَضَّأَ انْحَلَّتْ عُقْدَةٌ، فَإِنْ صَلَّى انْحَلَّتْ عُقْدَةٌ، فَأَصْبَحَ نَشِيطًا طَيِّبَ النَّفْسِ وَإِلَّا أَصْبَحَ خَبِيثَ النَّفْسِ كَسْلاَنَ»
তোমাদের কেউ যখন ঘুমিয়ে থাকে, শয়তান তার মাথার পেছনে তিনটি গিট দেয়…। ব্যক্তি যখন জাগ্রত হয়ে আল্লাহর জিকির বা দোয়া করে, তখন একটি গিট খুলে যায়। যখন সে ওযূ করে, তখন দ্বিতীয় গিটটি খুলে যায়। আর যখন সে সালাত (নামাজ) আদায় করে, তখন সব গিট খুলে যায়। ফলে সে পবিত্র মন ও প্রফুল্ল চিত্তে সকাল যাপন করে। অন্যথায় সে অলস ও কলুষিত মন নিয়ে সকাল করে।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১১৪২)
পরিশেষে বলতে চাই যে, ঘুম থেকে জেগে ওঠার পর রাসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শেখানো আমলগুলো কেবল কিছু আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং এটি একজন মুমিনের পুরো দিনটিকে বরকতময় ও সুরক্ষিত করার শ্রেষ্ঠ মাধ্যম। ঘুমকে ‘ছোট মৃত্যু’র সাথে তুলনা করা হয়েছে, তাই ঘুম থেকে অক্ষতভাবে জেগে উঠতে পারা আল্লাহর এক মহান নিআমত। তাই প্রতিদিন সকালে এই মাসনুন আমলগুলোর নিয়মিত অনুশীলন আমাদের ইহকালীন শান্তি ও পরকালীন মুক্তির পথকে সুগম করে।
হে আল্লাহ তুমি আমাদেরকে ঘুম থেকে উঠার আদবগুলি পালন করার তাওফীক দাও, আমীন। وَآخِرُ دَعْوَانَا أَنِ الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِين
