আল্লাহ তাআলা কি সর্বত্র বিরাজমান ?

আল্লাহ তাআলা কি সর্বত্র বিরাজমান ?

লেখক : তাজাম্মুল হক সালাফী

اَلسَّلَامُ عَلَيْكُمْ وَرَحْمَةُ اللهِ وَبَرَكَاتُهُ

الْحَمْدُ لِلَّهِ، وَالصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ عَلَى رَسُولِ اللَّهِ، أَمَّا بَعْدُ  فاَعُوذُ بِاللَّهِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيمِ  بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّجِيمِ  – للَّهُ الَّذِي خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ وَمَا بَيْنَهُمَا فِي سِتَّةِ أَيَّامٍ ثُمَّ اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ مَا لَكُمْ مِنْ دُونِهِ مِنْ وَلِيٍّ وَلَا شَفِيعٍ أَفَلَا تَتَذَكَّرُونَ (4)

ইসলামী আকীদা এবং আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামায়াতের (সাহাবী, তাবেয়ী এবং চার ইমামের) সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আল্লাহ তাআলা সত্তাগতভাবে সর্বত্র বিরাজমান নন কুরআন ও সহীহ হাদীসের অকাট্য দলীল অনুযায়ী, আল্লাহ তাআলা স্বীয় সত্তা নিয়ে আরশের ওপর অবস্থিত তবে তিনি তাঁর জ্ঞান (ইলম), ক্ষমতা, শ্রবণ ও দর্শনের মাধ্যমে সৃষ্টিজগতের সর্বত্র বিরাজমান এবং প্রতিটি সৃষ্টির সবচেয়ে কাছে রয়েছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন

للَّهُ الَّذِي خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ وَمَا بَيْنَهُمَا فِي سِتَّةِ أَيَّامٍ ثُمَّ اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ مَا لَكُمْ مِنْ دُونِهِ مِنْ وَلِيٍّ وَلَا شَفِيعٍ أَفَلَا تَتَذَكَّرُونَ (4)

আল্লাহ, যিনি আসমান ও যমীন এবং এ দু’য়ের মধ্যে যা কিছু আছে, তা ছয়দিনে সৃষ্টি করেছেন। তারপর তিনি আরশের উপর উঠেছেন। তিনি ছাড়া তোমাদের জন্য কোন অভিভাবক নেই এবং নেই কোন সুপারিশকারী। তবুও কি তোমরা উপদেশ গ্রহণ করবে না (সাজদা-৪)

الرَّحْمَنُ عَلَى الْعَرْشِ اسْتَوَى

পরম করুণাময় আল্লাহ আরশের ওপর সমাসীন হয়েছেন (সূরা ত্বয়া-হা, আয়াত-৫)।”

সারকথা : আয়াত দুটির অনুবাদ থেসে স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে যে, আল্লাহ তাআলা আরশের উপর নিজের নিজের মর্যাদা ও শান অনুযায়ী রয়েছেন। একই রকম কথা কুরআনের আরো ৫টি আয়াতে বর্ণিত হয়েছে। আয়াতগুলি সূরা আল-আ’রাফ- ৫৪, সূরা ইউনুস- ৩, সূরা রা’দ- ২, সূরা ফুরকান- ৫৯,  সূরা হাদীদ- ৪) ا

) কুরআনের দলীল : আল্লাহ তাআলা বলেন-

أَأَمِنتُم مَّن فِي السَّمَاءِ أَن يَخْسِفَ بِكُمُ الْأَرْضَ

তোমরা কি নিরাপদ হয়ে গেছ তাঁর থেকে, যিনি আসমানের ওপরে (আকাশের ঊর্ধ্বে) রয়েছেন এই মর্মে যে, তিনি তোমাদেরকে যমীনে ধসিয়ে দেবেন না ? (সূরা আল-মুলক, আয়াত: ১৬)।

ফেরেশতা এবং আমল আকাশের উপর ‍উত্থিত হয় : আল্লাহ তাআলা বলেন-

إِلَيْهِ يَصْعَدُ الْكَلِمُ الطَّيِّبُ وَالْعَمَلُ الصَّالِحُ يَرْفَعُهُ

তাঁরই দিকে আরোহণ করে পবিত্র বাক্যসমূহ এবং সৎকর্ম তাকে ওপরে উন্নীত করে(সূরা ফাতির, আয়াত: ১০) ।”

২) হাদীসের দলীল : ক) ক্রীতদাসীর বিখ্যাত হাদীস

قَالَ: وَكَانَتْ لِي جَارِيَةٌ تَرْعَى غَنَمًا لِي قِبَلَ أُحُدٍ وَالْجَوَّانِيَّةِ، فَاطَّلَعْتُ ذَاتَ يَوْمٍ فَإِذَا الذِّيبُ قَدْ ذَهَبَ بِشَاةٍ مِنْ غَنَمِهَا، وَأَنَا رَجُلٌ مِنْ بَنِي آدَمَ، آسَفُ كَمَا يَأْسَفُونَ، لَكِنِّي صَكَكْتُهَا صَكَّةً، فَأَتَيْتُ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَعَظَّمَ ذَلِكَ عَلَيَّ، قُلْتُ: يَا رَسُولَ اللهِ أَفَلَا أُعْتِقُهَا؟ قَالَ: «ائْتِنِي بِهَا» فَأَتَيْتُهُ بِهَا، فَقَالَ لَهَا: «أَيْنَ اللهُ؟» قَالَتْ: فِي السَّمَاءِ، قَالَ: «مَنْ أَنَا؟» قَالَتْ: أَنْتَ رَسُولُ اللهِ، قَالَ: «أَعْتِقْهَا، فَإِنَّهَا مُؤْمِنَةٌ»

মু’আবিয়াহ ইবনুল হাকাম আস সুলামী (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন : আমার এক দাসী ছিল। সে উহুদ ও জাওওয়ানিয়াহ এলাকায় আমার বকরীপাল চরাত। একদিন আমি হঠাৎ সেখানে গিয়ে দেখলাম তার বকরী পাল থেকে বাঘে একটি বকরি নিয়ে গিয়েছে। আমি তো অন্যান্য আদম সন্তানের মতো একজন মানুষ। তাদের মতো আমিও ক্ষোভ ও চপেটাঘাত করলাম। এরপর আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে আসলাম (এবং সব কথা বললাম) কেননা বিষয়টি আমার কাছে খুবই গুরুতর মনে হলো। আমি জিজ্ঞেস করলামঃ হে আল্লাহর রসূল! আমি কি তাকে (দাসী) মুক্ত করে দিব? তিনি বললেনঃ তাকে আমার কাছে নিয়ে আসো। সুতরাং আমি তাকে এনে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে হাজির করলাম। তিনি তাকে (দাসীকে) জিজ্ঞেস করলেনঃ (বলো তো) আল্লাহ কোথায়? সে বলল-আকাশে। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, (বলো তো) আমি কে? সে বললঃ আপনি আল্লাহর রসূল। তখন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে বললেনঃ তুমি তাকে মুক্ত করে দাও, সে একজন মু’মিনাহ নারী(সহীহ মুসলিম, হাদীস নং: ৫৩৭) ।

খ) মিরাজের ঘটনা :  জিবরীল আলাইহিস সালাম নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে  বাইতুল মাকদেস থেকে সিরাতুল মুনতাহা পর্যন্ত বিশেষ বাহনে করে এক রাতে সফর করান। এ ঘটনাকে মিরাজ বলা হয়।  িসদরাতুল মুনতাহায় থাকাকালীন পর্দার অন্তরালে থেকে আল্লাহ তায়ালার সঙ্গে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এর কথোপকথন হয়। এ ঘটনাও প্রমাণ করে যে, আল্লাহ তাআলা আরশের উপরে রয়েছেন। মিরাজ সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে মুসলিম-১৬২ পড়ুন।

গ) যাইনব বিনতে জাহাশের বিবাহ আকাশের উপর থেকে হয়েছিল :  

فَكَانَتْ تَفْخَرُ عَلَى أَزْوَاجِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ تَقُولُ: «زَوَّجَكُنَّ أَهْلُكُنَّ وَزَوَّجَنِي اللَّهُ مِنْ فَوْقِ سَبْعِ سَمَاوَاتٍ»

িতনি রাযিয়াল্লাহু আনহা নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর স্ত্রীদের সামনে গর্ব ভরে বলতেন : তোমাদেরকে তোমাদের পরিবারের লোকেরা বিয়ে দিয়েছেন আর আমা বিয়ে দিয়েছেন সাত আসমানের উপর েথকে আল্লাহ তাআলা (তিরমিযী-৩২১৩, সহীহ-আলবানী) এ হাদীস থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, আল্লাহ তাআলা সাত আসমানের উপর আরশের উপর রয়েছেন।  

) সর্বত্র বিরাজমান ধারণার বিভ্রান্তির কারণ ও সঠিক ব্যাখ্যা : আল্লাহ তাআলা বলেন-

وَهُوَ اللَّهُ فِي السَّمَاوَاتِ وَفِي الْأَرْضِ يَعْلَمُ سِرَّكُمْ وَجَهْرَكُمْ وَيَعْلَمُ مَا تَكْسِبُونَ (3)

আর আসমানসমূহ ও যমীনে তিনিই আল্লাহ, তিনি জানেন তোমাদের গোপন ও প্রকাশ্য এবং জানেন যা তোমরা অর্জন কর। 

وَهُوَ مَعَكُمْ أَيْنَ مَا كُنْتُمْ وَاللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ بَصِيرٌ (4)

তোমরা যেখানেই থাকো না কেন, তিনি তোমাদের সাথেই আছেন। আল্লাহ সব কিছুই দেখেন যা কিছু তোমরা কর (সূরা আল-হাদীদ-৪)।

এরকম ধরনের আরো কিছু আয়াত আছে যা থেকে বোঝা যায় যে, আল্লাহ আমাদের সঙ্গে রয়েছেন। তাই অনেকের ধারণা যে আল্লাহ সর্বত্র বিরাজমান। কিন্তু তাদের এ ধারণা সঠিক নয়। কারণ ওলামায়ে কেরাম এ বিষয়ে সঠিক ব্যাখ্যা দিয়েছেন। আল্লাহর সাথে থাকার মানে হল সব সময় আল্লাহ তাআলা তার বান্দার সাহায্যে রয়েছেন। ইমাম ইবনে কাসীরসহ প্রখ্যাত মুফাসসিরগণের মতে, এখানে আল্লাহ সত্তাগতভাবে সাথে থাকার কথা বলেননি, বরং তিনি তাঁর জ্ঞান (ইলম) ও দৃষ্টির মাধ্যমে সাথে আছেন বোঝানো হয়েছে। এর প্রমাণ আয়াতটির শুরু ও শেষেই আছে, যেখানে বলা হয়েছে আল্লাহ আরশের ওপর সমাসীন এবং তোমরা যা করো আল্লাহ তা দেখেন।

ইমাম আবু হানীফা (রহ.) বলেন : لَا اعرف رَبِّي فِي السَّمَاء اَوْ فِي الأَرْض فقد كفر وَكَذَا من قَالَ إِنَّه على الْعَرْش وَلَا ادري الْعَرْش أَفِي السَّمَاء اَوْ فِي الأَرْض যে ব্যক্তি বলে— আমি জানি না আমার প্রতিপালক আসমানে আছেন নাকি যমীনে, সে কুফরী করল। কারণ আল্লাহ বলেছেন, পরম করুণাময় আল্লাহ আরশের ওপর সমাসীন হয়েছেন। আর তাঁর আরশ তো সাত আসমানের ওপরে রয়েছে।” — (আল-ফিকহুল আবসাত , খন্ড-১ , পৃ-১৩৫)

ইমাম মালিক (রহ.) বলেন : وَقَالَ مَالِكٌ: «اللَّهُ فِي السَّمَاءِ وَعِلْمُهُ فِي كُلِّ مَكَانٍ لَا يَخْلُو مِنْ عِلْمِهِ مَكَانٌ» আল্লাহ তাআলা আসমানে আছেন এবং তাঁর জ্ঞান (ইলম) সব জায়গায় রয়েছে। কোনো স্থানই তাঁর জ্ঞান থেকে খালি নেই।” (আসসুন্নাতু লি আব্দুল্লাহ বিন আহমাদ- ২১৩)

 উপসংহার ও দুআ :

আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামায়াতের আলেমদের মূল কথা হলো— আল্লাহ তাআলা তাঁর সৃষ্টিজগত থেকে সম্পূর্ণ আলাদা (বায়েন)। তিনি আরশের ওপর থেকেও পৃথিবীর প্রতিটি ধূলিকণা স্পষ্ট দেখেন, শোনেন এবং নিয়ন্ত্রণ করেন । মানুষের ঘাড়ের প্রধান শিরার থেকেও আল্লাহ কাছে রয়েছেন (সূরা ক্বাফ-১৬), এর অর্থও হলো আল্লাহর ফেরেশতারা এবং আল্লাহর কুদরতী জ্ঞান মানুষের সবচেয়ে কাছে অবস্থান করে।

হে আল্লাহ! তুমি আমাদেরকে এ বিষয়ে সঠিক দান করো, আমীন।ওয় আখিরু দাওয়ানা আনিল হামদুলিল্লাহি রাব্বিল আলামীন।

Leave a Reply